পোল্যান্ডের কবিতাপ্রেমে বাংলাদেশি কবির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
পোল্যান্ডের কবিতাপ্রেমে বাংলাদেশি কবির স্বীকৃতি

পোল্যান্ড থেকে ফিরে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই কাজিমেয়ারেজ বুরনাতের ই-মেইল পেলাম। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর কাছে কাতারজিনার মাধ্যমে প্রাপ্ত আমার একটি কবিতা পোল্যান্ডের একটি পত্রিকায় ছাপার জন্যে আমার সম্মতি আছে কি না। আমি ফিরতি চিঠিতে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখলাম, অবশ্যই সম্মতি রয়েছে। কিছু দিনের মধ্যে 'হাইব্রিডা' নামের সাহিত্য পত্রিকার ৪৬ পৃষ্ঠায় পাশাপাশি আমির ও আমার কবিতা ছাপা হলো। আমি একটি পিডিএফ কপি পেলাম। এটি ছিল মূলত একটি আর্ট ম্যাগাজিন, বিশাল আকৃতির পত্রিকা, উন্নত কাগজে ছাপা (পরের বছর অবশ্য মূল কপিটি হাতে পাই)। 'ক্রিটিকা লিটারিকা'র সাইজটিও ছিল এমন যা আমাদের দেশগুলোয় সচরাচর দেখা যায় না। পত্রিকায় আমার 'হাত ধরে রেখেছে সময়' নামে দীর্ঘ কবিতাটি পোলিশ ভাষায় ছাপা হয়েছে।

পুরস্কার ও অপারেশন

ডিসেম্বরের শেষের দিকে কাজিমেয়ারেজ বুরনাত আমাকে ন্যাম আন্তর্জাতিক কবিতা পুরস্কারের জন্যে ফর্ম পাঠিয়ে দিলেন। বললেন যে তিনি ইতোমধ্যে রিকম্যান্ড করেছেন। শুধু এই ফর্মটি পূরণ করে আমার বেশ কয়েকটি কবিতাসহ নির্দিষ্ট অ্যাড্রেসে ই-মেল করতে হবে। মার্চে পুরস্কার ঘোষণা করা হলো, আমি পেয়ে গেলাম ক্রিয়েটিভিটি শাখায়। ওদিকে খবর পেলাম কাজিমেয়ারেজ বুরনাতের ক্যানসারের আরো কয়েকটি অপারেশন বাকি। নিয়মিত চিকিৎসা তো চলছিলই। কাতারজিনার মাধ্যমেও খবর পাচ্ছিলাম।

উৎসবে আমন্ত্রণ

গ্রীষ্মের শুরুর দিকে তিনি আমাকে লিখলেন প্রিয় পাঁচ জন কবির নাম, ই-মেল অ্যাড্রেস ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পাঠাতে। তিনি এদেরও বিশতম কবিতা উৎসবে আমন্ত্রণ জানাবেন। পরে জেনেছিলাম তিনি আমির ও মিলিটুনের কাছেও এমন লিস্ট চেয়েছিলেন। যাহোক, আমার নির্বাচিত পাঁচ জনের চারজন শেষ পর্যন্ত আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, তবে এদের মধ্যে আমার স্ত্রী, নাজনীন সীমন, ও মেক্সিকান কবি রবার্টো ম্যান্ডোজা আইয়েলা উপস্থিত হয়েছিলেন। নিউজিল্যান্ডের কবি স্যু জু ও ইংল্যান্ডে বসবাসরত ইরাকি কবি হাতিফ জানাবি পারিবারিক কারণে শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্ত্রীর সঙ্গী হওয়া

প্রতি বছরই দেখি কোনো কোনো কবি স্ত্রীকে নিয়ে আসেন কবিতা উৎসবে, যেমন হুলিয় পাভানেট্টি তাঁর স্ত্রী এনাবেলাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান বিশ্বময়, যদিও এনাবেলা নিজেও একজন কবি, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে মাদ্রিদে কবিতা উৎসব করেন। আবার সুইডিশ কবি বেঙ্কট বিয়ারকুন্ড তাঁর আর্টিস্ট স্ত্রী গুটরুটকে ছাড়া কোথাও পা বাড়ান না, যদিও বয়সের কারণে স্ত্রী তাঁকে একা ছাড়তে নারাজ। অস্ট্রিয়ার কবি ম্যানফ্রেড কোবোর্টও স্ত্রীকে নিয়েই এসব অনুষ্ঠানে যান। তবে, এঁদের প্রত্যেকের বয়স সত্তরের উপরে। ওদিকে পোলিশ কবিতা উৎসবে বন্ধুরা সব সময়ে জানতে চেয়েছেন আমি কেনো আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাই না। প্রথমত, তিনিও স্কুল সিস্টেমে চাকরি করেন, তাই ছুটি পাওয়া তার পক্ষে বেশ দুষ্কর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে আমি সর্বদাই চেয়েছি তিনি আমার স্ত্রী হিসেবে নন, একজন বাঙালি কবি হিসেবেই উৎসবে যোগ দেবেন।

২০২৪ সালের সুযোগ

২০২৪ সালে সেই সুযোগ আসে। আমরা নভেম্বরের তেরো তারিখ ভ্রসলোভ বিমান বন্দরে অবতরণ করি। রবার্টেও একই বিমানে আরোহী ছিলেন। তবে, বিমানবন্দর থেকে কাতারজিনা সীমন ও আমাকে তাঁর গাড়িতে করে নিয়ে গেলেও, রবার্টোকে অপেক্ষা করতে হয় আরো কিছুক্ষণ—লাগেজ পরিবহনের কারণেই এমনটি হয়। কাতারজিনার গাড়িটি বেশ ছোটো, আর আমি একটি বড়ো লাগেজ নিয়েছিলাম আমার সম্পাদিত ও অতি সম্প্রতি প্রকাশিত বই 'ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি এন্থোলজি'র বেশ কিছু কপি বহন করার জন্যে। ভ্রসলোভ থেকে পোলানিৎজা-স্দ্রুইর দূরত্ব একেবারে কম নয়, গাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল। দীর্ঘ কৃষি জমি পার হয়ে আমরা টিলা পাহাড় ঘেরা যে শহরটিতে পৌঁছলাম তার পাশ দিয়ে ছোট্ট একটা নদী, বাইসট্রিকা ডাসনিস্কা, প্রবাহিত। এখানকার নদীগুলোকে খাল বললেই ভালো হয়, কারণ এদের প্রস্থ তেমন দীর্ঘ নয়।

পুরস্কার ও পরবর্তী কার্যক্রম

অন্যান্য বার থেকে এবছর আমার আরেকটি আনন্দ হলো যে আমার স্ত্রীও ছিলেন কবির মর্যাদায় এবং তিনি এতটাই আয়োজকদের প্রিয় হয়ে উঠলেন যে পরের বছরের জন্যেও দাওয়াত আদায় করে নিলেন। রবার্টোর ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। উৎসবের দ্বিতীয় দিন হঠাৎ করেই আমার নাম ঘোষণা করা হলো কবি পল হেসে আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্যে। হেসে জার্মান কবি যিনি ১৯১০ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন। আমার সাথে আরো পুরস্কার দেওয়া হলো কবি ও আয়োজক কাজিমেয়ারেজ বুরনাতকে। উৎসব শেষে সীমন আর রবার্টো নিউইয়র্কে একসাথে ফিরে গেলেও আমি থেকে গেলাম কাতারজিনার বাসায় দশ দিনের জন্যে কারণ আমাকে সেখান থেকে যেতে হবে ভারতের অডিশা আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে। কাতারজিনার কল্যাণে সেই দশ দিনও ছিল কানায় কানায় কবিতা দিয়ে পূর্ণ। পরপর চারদিন একক কবিতাপাঠের আসর, প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা প্রতিদিন কবিতাপাঠ, তারপরে প্রশ্নোত্তর পর্ব ও বুক সাইনিং। কয়েকটি স্কুলেও গিয়েছিলাম ছাত্রদের সাথে কবিতা নিয়ে আলাপ করতে। তাদেরও কত কত প্রশ্ন। বেশ আনন্দের সাথে কেটেছিল। তাছাড়া মিলিসটিভি-র ইউটিউব চ্যানেলে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলাম। শেষ অনুষ্ঠানটি ছিল ওয়ারশতে। আমরা ওয়ারশ শহরে কবি ও সম্পাদক মারলেনা জিংগারের বাসায় ছিলাম। তিনি ওয়ারশ লিটারেচার হাউজে আমার জন্যে কবিতাপাঠের আয়োজন করেছিলেন। স্বল্প সময়ের নোটিশে সেদিন দর্শক সারিতে তেমন লোক ছিল না। কিন্তু আমি অনুষ্ঠানটি বেশ উপভোগ করেছিলাম। পরের দিন আমাদের তিনি ওয়ারশ ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। আর কাতারজিনা একেবারে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।