রাজধানী ঢাকার মুগদা এলাকা থেকে সৌদি প্রবাসী মোকাররম মিয়ার আট টুকরা লাশ উদ্ধারের মামলায় প্রেমিকা তাসলিমা বেগম ওরফে হাসনার বোন হেলেনা বেগম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া হেলেনার মেয়ে হালিমা আক্তার কিশোরী হওয়ায় তাকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতে হাজির ও জবানবন্দি
মঙ্গলবার (১৯ মে) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুগদা থানার এসআই এনামুল হক মিঠু তাদের আদালতে হাজির করেন। হেলেনা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন এবং পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
অন্যদিকে, কিশোরী হালিমা আক্তারকে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর বিচারক মো. মনিরুজ্জামান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মারুফুজ্জামান।
নিহতের পরিচয় ও ঘটনার সূত্রপাত
নিহত মোকাররম মিয়া (৩৮) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর এলাকার বাসিন্দা। গত রবিবার (১৭ মে) রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকা থেকে কয়েক টুকরো মরদেহ উদ্ধারের পর আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
এর আগে সোমবার (১৮ মে) র্যাব-৩ এর সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন স্কোয়াড্রন লিডার মো. সাইদুর রহমান।
সম্পর্ক ও হত্যার পরিকল্পনা
তিনি জানান, মোকাররমের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেক প্রবাসীর স্ত্রী তাসলিমা আক্তারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত ১৩ মে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে তিনি সরাসরি মুগদার মান্ডায় তাসলিমার বান্ধবী হেলেনার ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে হেলেনা তার ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। খবর পেয়ে তাসলিমাও ওইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় আসেন।
তদন্তে জানা যায়, মোকাররম ও তাসলিমার মধ্যে আর্থিক লেনদেন ছিল এবং তাদের কিছু আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। একপর্যায়ে বিয়ে নিয়ে আলোচনা হলে তাসলিমা রাজি না হওয়ায় মোকাররম তার দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা ফেরত চান এবং ছবি-ভিডিও প্রকাশের হুমকি দেন। একইসঙ্গে হেলেনা অভিযোগ করেন, মোকাররম তার মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার জেরে তাসলিমা ও হেলেনা মিলে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ১৪ মে সকালে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তাকে অচেতন করার চেষ্টা করা হয়। পরে বালিশ চাপা ও হাতুড়ি-বটি দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন হেলেনা ও তাসলিমা। এরপর মরদেহ বাথরুমে নিয়ে আট টুকরো করেন।
মরদেহ গোপন ও গ্রেফতার
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, পরে মরদেহের খণ্ডাংশ পলিথিন ও বস্তায় ভরে বাসার আশপাশে ফেলে দেন তারা। মাথার অংশ অন্যত্র নিয়ে ফেলা হয়। ঘটনার পরদিন তারা বাইরে ঘোরাফেরা করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। সবকিছু স্বাভাবিক দেখাতে তারা বাসার ছাদে আড্ডা ও খাবারের আয়োজনও করেন।
দুই দিন পর দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয়রা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় নিশ্চিত হয় পুলিশ। এরপর রবিবার রাতে হেলেনা ও তার মেয়েকে গ্রেফতার করে নিহতের মাথার অংশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের চাচা রফিকুল ইসলাম সোমবার মুগদা থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে অভিযান চালিয়ে মুগদার মান্ডা এলাকা থেকে হেলেনা ও তার মেয়েকে গ্রেফতার করে পুলিশ ও র্যাব।



