খাগড়াছড়ি শহরের বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় এলাকায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই শুরু হয় শত শত টিয়ার কোলাহল। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে উঁচু গাছের ডালে বসে তারা দিনের ক্লান্তি ঝেড়ে নেয়। পাখির কিচিরমিচির শব্দে পথচারীরা ভুলে যান এটি শহরের একটি ব্যস্ত এলাকা।
এক দশকের বেশি সময় ধরে টিয়ার আবাস
প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে এভাবেই রেঞ্জ কার্যালয় প্রাঙ্গণের আকাশমণি, মেহগনি, জাম, জারুল, কাঁঠালসহ বড় গাছগুলোকে রাতের আশ্রয়স্থল বানিয়েছে মদনা বা লাল-বুক টিয়া। শিকারিদের উৎপাত না থাকা এবং বন বিভাগের নজরদারির কারণে জায়গাটি এখন তাদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল। সারি সারি গাছের ডালজুড়ে টিয়া পাখির এমন সরব উপস্থিতি দেখতে অনেকে ভিড় জমান। সকালে ও বিকেলে হাঁটতে বের হলে চলে আসেন রেঞ্জ কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়। তোলেন ছবিও।
পরিচিতি ও পরিবেশ
খাগড়াছড়ির শহরে ঢুকতেই বাস টার্মিনালের অদূরে বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়। কার্যালয়ের পাশ ঘেঁষে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক। পাঁচিল ও কাঁটাতারে ঘেরা কার্যালয় প্রাঙ্গণে কয়েক শ ফলদ ও বনজ গাছ। বৃক্ষ শোভিত এলাকাটিতে টিয়া ছাড়াও শালিক, ফিঙে ও বাদুড় আসে নিয়মিত। প্রচুর ফল গাছ থাকায় এলাকাটি পাখির প্রিয়। এখানকার বাসিন্দারা জানান, ভোর ছয়টার দিকে টিয়া পাখির দল গাছ ছেড়ে চলে যায়। আবার সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসে। সন্ধ্যার সময়টা তাই এই এলাকা অন্য রকম হয়ে ওঠে।
কার্যালয়ের পাশের পাড়ার বাসিন্দা সুমন চাকমা বলেন, ‘প্রথম দিকে এত পাখি দেখে অবাক হতাম। এখন প্রতিদিনই দেখি। সন্ধ্যার সময় আর ভোরবেলায় এখানে দাঁড়ালে মনে হয় যেন কোনো পাখির অভয়ারণ্যে আছি। পাখিগুলো এখন এই পরিবেশেরই অংশ হয়ে গেছে।’ আরেক বাসিন্দা মোবারক হোসেন টিয়ার ঝাঁক দেখতে রেঞ্জ কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় প্রতিদিন ভোরবেলায় হাঁটতে যান। তিনি বলেন, ‘শহরের ভেতরে এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। সবুজ গাছের ওপর লাল–বুক টিয়ার ঝাঁক দেখতে সত্যিই অসাধারণ লাগে।’
বন বিভাগের ভূমিকা
খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন জানান, টিয়া পাখিগুলো ১০ থেকে ১২ বছর ধরে রেঞ্জ কার্যালয়ে আসছে। তিনি বলেন, ‘পাখিগুলো এখানে রাত কাটায়। ভোরে তারা পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় খাবারের সন্ধানে চলে যায়। আবার সন্ধ্যার সময় ফিরে আসে। কেউ যাতে শিকার করতে না পারে, সে জন্য সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা রয়েছে। বন বিভাগের বিশেষ টিম কাজ করছে।’ এ বছর পাখির খাদ্যের জন্য প্রায় দুই শ ফলদ গাছ রোপণ করেছে বন বিভাগ। রোপণ করা গাছের মধ্যে রয়েছে উদাল, গুটি জাম, বট, পাকুড়, আম, পেয়ারা ও ডেউয়া। এসব ফল টিয়াদের খাদ্য, আর গাছগুলো তাদের আশ্রয়।
পরিবেশগত গুরুত্ব
সাংবাদিক ও বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী সমির মল্লিক বলেন, ‘লোকালয়ের আশপাশে বড় শিকারি পাখির উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকায় টিয়াগুলো এখানে বেশি নিরাপদ বোধ করে। দিনে দূরে গেলেও রাতে নিরাপদ জায়গায় ফিরে আসা তাদের স্বাভাবিক আচরণ।’ টিয়া পাখি শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না—তারা বীজ ছড়িয়ে বন বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ক্ষতিকর পোকামাকড়ও খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
সংরক্ষিত প্রজাতি
বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইনে মদনা বা লাল বুক টিয়া সংরক্ষিত বলে জানালেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা। তিনি বলেন, ‘এদের দেহ সবুজ, বুক লালচে, মাথা ধূসর এবং চোখ হলুদ। পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে আমরা কাজ করছি। নতুন করে গাছ লাগানো হচ্ছে। পাহারা জোরদার করা হয়েছে। সবই করা হয়েছে টিয়াদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য। বন বিভাগ শুধু টিয়া পাখিদের অভয়াশ্রম করেনি। এখানে বাদুড় এবং বিভিন্ন জাতের পাখিও রয়েছে।’
মদনা টিয়ার বিবরণ
পাখিবিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান এক লেখায় এই পাখির বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, মদনা টিয়া লাল-বুক টিয়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Red Breasted Parakeet, Moustached Prakeet। Psittacidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম psittacula alexandri। মদনা টিয়ার দৈর্ঘ্য ৩৮ সেন্টিমিটার ও ওজন ১০০-১৩০ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষের রঙে পার্থক্য থাকে। পুরুষের মাথা হালকা ধূসর। দুচোখের মাঝখানে, কপালে নাসারন্ধ্রের ঠিক ওপরে রয়েছে কালো ফিতে। থুতনিতে মোটা কালো গোঁফের মতো রেখা। গলা ও বুক পিচ ফলের মতো লাল। মাথা বাদে দেহের ওপরের অংশ ও পেট ঘাস-সবুজ। নীলচে সবুজ লেজের আগা হলুদ। দুই ডানার ওপর একচিলতে হলুদ রং। লেজের তলা হলদে সবুজ। পুরুষের ওপরের ঠোঁট প্রবালের মতো লাল ও নিচের ঠোঁট কালচে বাদামি। চোখ হলদে। পা, নখ ও পায়ের পাতা হলদে ধূসর। স্ত্রীর উভয় ঠোঁটই কালো। মাথায় নীলচে সবুজ আভা থাকে। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে অনেকটা মায়ের মতো, তবে পালক অনুজ্জ্বল, গোঁফরেখা অসম্পূর্ণ, লেজ খাটো ও ঠোঁট হালকা গোলাপি।



