২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হলে তেহরানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সময়ও তেহরানের একটি বইয়ের দোকান প্রতিদিন খোলা ছিল। দোকানের মালিক ও তার অংশীদার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বোমায় দোকান ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তারা দরজা বন্ধ করবেন না। কর্মীদের অনেকেই ছুটিতে শহর ছেড়ে গেলেও তারা দুজন থেকে যান।
যুদ্ধের মধ্যে পাঠকের আশ্রয়স্থল
যুদ্ধের প্রথম দিকে দোকানে খুব কম মানুষ আসতেন। একদিন এক নিয়মিত পাঠক গাড়িতে বসে দোকানের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, স্বামী অফিসে থাকলে একা বাড়িতে থাকতে তার ভয় লাগে। তাই প্রতিদিন তিনি বইয়ের দোকানে এসে বসে থাকতেন। বিস্ফোরণের শব্দ উঠলেই দোকানে থাকা সবাই মেঝেতে বসে পড়তেন। কেউ নিজের ভয় লুকানোর চেষ্টা করতেন না।
যুদ্ধের সময় বইয়ের দোকান ও অন্য যেকোনো দোকানের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। সব ব্যবসাই লোকবল, পণ্য ও ক্রেতার সংকটে পড়ে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তারা কাউকে জানাতেও পারেননি যে দোকান খোলা আছে। পরে অনেকেই এসে আফসোস করেছেন—জানলে তারাও যুদ্ধের দিনগুলোতে সেখানে এসে কিছুটা সময় কাটাতেন।
সংকটের মধ্যে টিকে থাকার ইতিহাস
তবে এই দোকানটির সংকটের মধ্যে টিকে থাকার ইতিহাস আগেও রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় দোকানটি চালু হয়েছিল। এরপর মাহসা জিনা আমিনির মৃত্যুর পরের আন্দোলন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ এবং নানা রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও তারা দোকান খোলা রেখেছেন। বিক্রেতার ভাষায়, 'মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই এই দোকানের দরজা বন্ধ করতে পারবে না।'
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাঠকদের বইয়ের পছন্দও বদলে যায়। আগে তারা লাতিন আমেরিকার লেখকদের বই পড়ে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিল খুঁজতেন। কিন্তু যুদ্ধ তাদের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইয়ের দিকে নিয়ে যায়।
যুদ্ধের বইয়ের চাহিদা বেড়েছে
সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয় ঘাদা সাম্মানের 'বেইরুট নাইটমেয়ার্স'। লেবাননের গৃহযুদ্ধ নিয়ে লেখা এই বইয়ে যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থাকার বাস্তব অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। একইভাবে পাঠকেরা খুঁজতে থাকেন নুহা আল-রাদির 'বাগদাদ ডায়ারিজ'—ইরাক যুদ্ধের সময়কার দিনলিপি। দোকানের কর্মীরা আবার অনেকের হাতে তুলে দেন প্রিসিলা মরিসের 'ব্ল্যাক বাটারফ্লাইজ'। সারায়েভোর যুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে একজন শিল্পীর নিজের শহর ছেড়ে না যাওয়ার গল্প বলা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবু প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বইয়ের দোকানটি খোলা থাকে। যুদ্ধের সময় যেসব বই মানুষকে সাহস ও সঙ্গ দিয়েছে, সেগুলোর সব কপিই বিক্রি হয়ে গেছে। নতুন সংস্করণ কবে আসবে, তা কেউ জানে না।



