হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে ক্রিসমাসের সন্ধ্যা: এক অদ্ভুত সাক্ষাৎ
হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে ক্রিসমাসের সন্ধ্যা

ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় হাসপাতালের সিটি স্ক্যান বিভাগের ওয়েটিং রুম। সেখানে তিনজন। একজন আমি, একজন আশির কাছাকাছি এক ভদ্রমহিলা হুইলচেয়ারে, আর একজন ট্রলিতে—অচেতন মনে হচ্ছে, মাঝে মাঝে নড়ছেন। ভদ্রমহিলার পাশে রাখা বড় নীল স্যুটকেস বারবার চোখে পড়ছে। এত বড় স্যুটকেস হাসপাতালে কেন? বিশেষ করে ক্রিসমাসের সন্ধ্যায়!

অপেক্ষার মুহূর্ত

হালকা তুষার পড়ছে। বাতাসে টার্কির গন্ধ, কিন্তু ভেতরে কেবল স্যানিটাইজারের গন্ধ। সিটি স্ক্যান ডিপার্টমেন্ট সাধারণত নির্জন, আজ আরও ফাঁকা। একজন নার্স এসে আইডি চেক করে চলে গেলেন। তারপর থেকে আর কেউ আসেনি। ঠান্ডার মধ্যেও এসি চলছে। কোথাও থেকে একঘেয়ে মেশিনের আওয়াজ আসছে। মনে হলো নিজের শ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছি।

হুইলচেয়ারের ভদ্রমহিলা মনোযোগ দিয়ে নিজের নখ দেখছেন—নখে ছোট ছোট ক্রিসমাস ট্রি আঁকা। তাঁকে পুরোনো দিনের পেইন্টিং মনে হচ্ছে। কানে পাই আকৃতির দুল, অগোছালো খোঁপা, হালকা মেরুন রঙের স্কার্ট। ট্রলির লোকটি এখন আর নড়ছেন না, কিন্তু মনিটরের সবুজ দাগ ওঠানামা করছে। ব্যাপারটা অস্বস্তিকর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হেনরি নামের বিড়াল

ঘরের সবচেয়ে মজার জিনিস কোণায় শুয়ে থাকা একটি বিড়াল। তার কলারে লেখা: হসপিটাল স্টাফ, হেনরি। হেনরি সিটি স্ক্যানে কীভাবে কাজে আসে, বোঝা যাচ্ছে না। আমি দুইবার ঘরের জিনিসপত্র গুনেছি। তৃতীয়বার শুরু করব, এমন সময় ভদ্রমহিলার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। তিনি অপেক্ষা করেছিলেন আমার গোনা শেষ হওয়ার জন্য। আমরা হালকা হাসলাম।

ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ

উনিই আগে কথা শুরু করলেন: 'তুমিও কি সিটি স্ক্যানের জন্য?' 'হ্যাঁ।' 'এরপর বাড়ি চলে যাবে?' আমি মাথা নেড়ে বললাম, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'আমার কিছুদিন পরপরই আসতে হয়। ওরা কী একটা ব্যাপার অবজারভেশনে রাখছে। তোমারও কি একই কারণে?' আমি এক মুহূর্ত থামলাম। এত ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না। 'হ্যাঁ, আমারও।' দেখে মনে হলো তিনি সঙ্গী পেলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একটু ঝুঁকে এসে বললেন, 'সিটি স্ক্যান ভালো নয়। ওই যে ইনজেকশনটা দেয়... প্রতিবার মনে হয়, বাথরুম হয়ে যাবে।' তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি বাসায় গিয়ে রান্না করবে?' আমি প্রায় যন্ত্রের মতো বললাম, 'না, গতকালের কিছু আছে। ওটাই খেয়ে নেব।' 'কী রান্না ছিল? বিরিয়ানি?' আমি কী খেয়েছি মনে নেই, কিন্তু মনে হলো তিনি বিরিয়ানি শুনতে চাচ্ছেন। 'হ্যাঁ। বিরিয়ানি।' 'ও... আমার হাসব্যান্ড ওটা খুব পছন্দ করত।' তিনি থামলেন। কথাটা মাঝপথে আটকে গেল। তারপর বললেন, 'ইশ... আমিও যদি তা-ই করতাম।'

শেয়াল আর পায়রার জন্য খাবার

আমি বললাম, 'হ্যাঁ, এটা হয়। অনেকে প্যাড পরে আসে।' তিনি হালকা হেসে বললেন, 'দেখো, এই বুদ্ধি আমার মাথায় আসেনি। পরেরবার আমিও তা-ই করব।' আবার সব চুপচাপ। পরের প্রশ্ন আমার করা উচিত, কিন্তু কোনো প্রশ্ন মাথায় আসছে না।

একজন নার্স এসে উঁকি দিয়ে গেলেন—বুকপকেটে কলমের ক্যাপের সঙ্গে ছোট সান্তা ক্লজ। সান্তা ক্লজকে খুব আনন্দিত দেখাচ্ছে, নার্সকে নয়। দেয়ালে কোথাও ঘড়ি নেই। আমি ফোনের স্ক্রিনে তাকালাম—দশ মিনিট পেরিয়েছে! অথচ মনে হচ্ছে এক যুগ বসে আছি।

ভদ্রমহিলার স্যুটকেসটা বেশ বড়—উজ্জ্বল নীল, অনেকটা আমাদের দেশের নীলের মতো। কোণে একটি হলদে স্টিকার, রং ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। লেখা: Be Happy. B আর H ফ্যাকাশে, দেখে মনে হয় 'e appy'। তিনি স্যুটকেসের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ ফিসফিস করে বললেন, 'হয়তো আজ ছেড়ে দেবে... স্ক্যান নরমাল হলে।' কথাটা কি আমাকে বললেন, না স্যুটকেসটাকেই?

নার্স লিডিয়া এলেন। তিনি খুব নৈপুণ্যের সাথে হুইলচেয়ারের লক খুললেন। 'আজ কি তোমার সারা দিন ডিউটি ছিল?' 'না, সবে শুরু করলাম।' 'তাহলে আজ ক্রিসমাসেও বাসায় যাওয়া হচ্ছে না?' 'না। এই ক্রিসমাসেও না।' 'আমি সত্যিই তোমাদের কাজের খুব প্রশংসা করি।' 'ধন্যবাদ, ডার্লিং। তুমি খুব মিষ্টি।'

এরপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, 'আসলে সব খাবার আমি শেয়ালদের দিয়ে দিয়েছি। ওরা খুব ক্ষুধার্ত। খাবার না পেয়ে রাস্তায় নেমে আসে। এত ঠান্ডা... কষ্ট হয় ওদের।' তিনি থামলেন। 'আসলে কিছুটা আমার জন্য রেখেছিলাম। কিন্তু বের হওয়ার আগে সেগুলোও পায়রাদের দিয়ে দিয়েছি।'

একাকী অপেক্ষা

আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে ওনার দিকে বসলাম। তিনি একাই কথা বলে যাচ্ছেন। আমার কিছু না বলাটাও এখন আর সমস্যা মনে হচ্ছে না। আমি বললাম, 'আজ তো সব বন্ধ। খাবার নিয়ে তো ঝামেলায় পড়বেন।' তিনি হেসে বললেন, 'ও কিছু না। আমি কিছু একটা ম্যানেজ করে নেব।' তারপর থেমে যোগ করলেন, 'তুমি বাড়িতে গিয়ে গরম কিছু খেয়ো।' 'আপনিও।'

আবার ওয়েটিং রুম শব্দহীন। তুষার থেমে গেছে। করিডরে দ্রুত পায়ের আওয়াজ। ফোন স্ক্রল করছি, কিন্তু কিছু দেখছি না। তিনি তাকিয়ে রইলেন নিজের স্যুটকেসের দিকে। নার্স লিডিয়া ফিরে এলেন: 'হ্যালো, আপনি কি সিনথিয়া?' 'হ্যাঁ ডার্লিং, আমিই।' নিজের নাম শুনে তাঁর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। 'তোমার কি মনে হয়, আমাকে আজ রাতে এখানে থাকতে হতে পারে?' 'হুম... বলা যাচ্ছে না। আজ অনেক ব্যাকলগ। লোকজনও কম। বুঝতেই তো পারছ, ক্রিসমাস।'

আজ রাতে যদি তাঁকে হাসপাতালে থেকে যেতে হয়, তাহলে শেয়াল আর কবুতরগুলো কী করবে? অ্যাম্বুলেন্সের আলো বরফের উপর পড়ছে। এখন ওটাকেও ক্রিসমাস ডেকোরেশনের অংশ মনে হচ্ছে। রুম হিটার চালু হওয়ার শব্দ হলো। একটু বাইরে যাওয়া দরকার। সময় যাচ্ছে না।

উনি আর কিছু বললেন না। শুধু দুই হাত কোলের কাছে নিয়ে এলেন। হুইলচেয়ারের চাকা ধীরে ধীরে দরজা পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল। জানালার বাইরে আরেকটা অ্যাম্বুলেন্স নিঃশব্দে এসে থামল। হঠাৎ রুমটা আরও বেশি ফাঁকা লাগছে। কেবল মনিটরটা নড়াচড়া করছে।

স্যুটকেসের গল্প

স্যুটকেসটা একসময় নিশ্চয়ই খুব সুন্দর ছিল। নীল রঙের। কোণে লেখা, e appy। ভদ্রমহিলার অনায়াস গল্প শুরু করার অভ্যাসটা বোধ হয় ছোঁয়াচে। আমার প্রায় ইচ্ছা করছিল স্যুটকেসটাকে জিজ্ঞেস করতে, তোমার গল্প কী? তুমি কেন এসেছ সঙ্গে?

বারান্দায় চলে এলাম। একটি অর্ধেক খাওয়া কফির কাপ মেঝেতে পড়ে আছে। ভেন্ডিং মেশিন কফি ভাঙছে। কফির ঘ্রাণ নাকে ধাক্কা দিল। বাসায় ফেরা দরকার। ফিরে একটা গরম কম্বলের নিচে চুপচাপ শুয়ে থাকতে হবে। একবার মনে হলো, কফি নিয়ে মেঝের কাপটার পাশেই বসি। করিডরে ঠান্ডা লাগছে। হ্যারি কী করছে এখন? বেচারাকে এখনো রাতের খাবার দেওয়া হয়নি। ইদানীং আমি ফিরতে দেরি করলে সে দরজার সামনে বসে থাকে।

ভেতর থেকে সিটি স্ক্যান রুমের দরজা খোলার শব্দ পেলাম। শব্দটা মুখস্ত হয়ে গেছে। ওরা ফিরে আসছে। আবার উনি নীল স্যুটকেসটার পাশে। এবার প্যাডিংটনের গলায় ম্যাজেন্টা রঙের ক্রিসমাস টিনসেল মাফলারের মতো ঝুলছে। আলো পড়ে চিকচিক করছে। প্যাডিংটনকে এখন বেশ হাসিখুশি লাগছে। হেনরি স্যুটকেসটার সঙ্গে মাথা ঘষছে। সিনথিয়া ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। দৃশ্যটা কোনো কারণে আমার খুব ভালো লাগছে।

স্যুটকেসটা একটু ঘুরে গেছে। এখন ওর আধখোলা চেইন দেখা যাচ্ছে। ওখান থেকে লাল-সবুজ চেকের একটা কাপড় উঁকি দিচ্ছে, আর পাশে সাদা পশমি কিছু—অনেকটা শীতের রাতে ঘুমানোর আগে পরার মোজার মতো। হঠাৎ করেই আমার মনে হলো, স্যুটকেসটা বাড়ি ফেরার জন্য গোছানো হয়নি। বাইরে আবার তুষার নামতে শুরু করেছে। ধীরে, একেবারে শব্দহীন।