বিদেশে একা ঈদ: স্মৃতি আর নতুন অভিজ্ঞতার মিশেলে এক ভিন্ন সকাল
দেশে থাকলে হয়তো পরিবারের সদস্যদের ডাকে ঘুম ভাঙত। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত সেমাইয়ের মিষ্টি গন্ধ। ফোনের পর ফোনে ভরে যেত ঈদের সকালটা। কিন্তু এখানে, বিদেশের মাটিতে, ঈদের সকালটা যেন একটু বেশিই চুপচাপ আর নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল।
রান্নাঘরে বাংলাদেশের স্বাদ খোঁজা
আগের রাতেই ঠিক করেছিলাম, যত দূরেই থাকি, ঈদের আমেজটা নিজের মতো করে তৈরি করব। তাই সকালবেলা টুকটাক রান্নায় হাত দিলাম। রান্নাঘরে মসলার ঘ্রাণটা যখন নাকে এসে লাগল, হঠাৎ মনে হচ্ছিল যেন কিছুটা হলেও বাংলাদেশকে এখানে নিয়ে আসতে পেরেছি। তবে শেষ পর্যন্ত তেহারিটা একটু বেশিই ঝাল হয়ে গিয়েছিল! আমার বিদেশি বন্ধুরা সেই তেহারি মুখে দিয়ে বলছিল, ‘দিস ইজ টু স্পাইসি!’ তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে হাসি পেলেও, মনে হলো এই রান্নাটাই যেন দূরের দেশের সঙ্গে একটা সংযোগ তৈরি করছে।
ক্লাসে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়
ঈদের নতুন জামা পরেই গিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেটা সায়েন্স ক্লাসে। মনে হচ্ছিল, কিছু না করার চেয়ে এটা হয়তো ভালো। ক্লাসেও কয়েকজনের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার সময় আরেকটা পরিবারের মতোই মনে হয়েছে। এই ছোট্ট মুহূর্তগুলো যেন একাকিত্বের ভার কিছুটা কমিয়ে দিল।
ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে দেখা
ক্লাস শেষে বাসায় ফিরে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বললাম। দেশে তখন ঈদের আগের রাত। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। স্ক্রিনের ওপাশে সেই চেনা দৃশ্য, আর এপাশে আমার নিঃশব্দ ঘর। কথা বলতে বলতেই বুঝতে পারলাম, মনটা কেমন ভারী হয়ে আসছে। যেন খুব কাছের কিছু, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়, তবু পাচ্ছি না। এই অনুভূতিটা প্রবাসী জীবনের একটা অপরিহার্য অংশ বলে মনে হলো।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও শহর দেখা
মনটা অন্যদিকে নিতে বিকেলে পাকিস্তানি বন্ধুদের ফোন করলাম। ঠিক করলাম, বাইরে বেরোব। আলমারি থেকে বের করলাম বাংলাদেশ থেকে আনা আমার প্রিয় কুর্তি। জামাটা পরার একটা উপলক্ষ তো পাওয়া গেল! এখানে মন্তে দেই কাপুচিনির ওপরে দাঁড়িয়ে পুরো তুরিন শহরটা দেখা যায়। সূর্য ডুবতে থাকা আলোয় আমরা একসঙ্গে ছবি তুললাম, হাসলাম, গল্প করলাম। এই মুহূর্তগুলো যেন একাকিত্বকে ভুলিয়ে দিল।
রেস্তোরাঁয় বিরিয়ানির স্বাদ
সন্ধ্যায় একটা রেস্তোরাঁয় গেলাম। আমি অর্ডার করলাম বিরিয়ানি। প্রথম গ্রাসেই মনে হলো স্বাদটা কত পরিচিত, কত কাছের! এই খাবারটা যেন দূরের দেশের স্মৃতিকে সজীব করে তুলল। বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম এই অনুভূতি, তারা বুঝতে পারল কীভাবে একটা সাধারণ খাবারও প্রবাসী জীবনে বিশেষ অর্থ বহন করে।
দিনের শেষে উপলব্ধি
দিনের শেষে বুঝলাম, এই ঈদটা হয়তো অন্য সব ঈদের মতো ছিল না, ছিল না পরিবারের ভালোবাসা, ব্যস্ততা। কিন্তু ছিল নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা, আর কিছু ছোট ছোট মুহূর্ত; যা আজীবন মনে থাকবে। প্রবাসে একা ঈদ কাটানো এই অভিজ্ঞতা শেখাল যে, স্মৃতি আর নতুনত্বের মিশেলেই জীবনকে সমৃদ্ধ করে।



