ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে সুনামগঞ্জের ১০ যুবকের ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে, যা একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের ভয়াবহ কার্যক্রমের নিষ্ঠুর পরিণতি হিসেবে সামনে এসেছে।
স্বপ্নভঙ্গের করুণ কাহিনী
পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনার লক্ষ্যে জমিজমা বিক্রি করে ইউরোপের পথে পা বাড়িয়েছিলেন এই যুবকরা। কিন্তু স্বপ্নের দেশে পৌঁছানোর আগেই ভূমধ্যসাগরে তাদের জীবনাবসান ঘটে। নিহতদের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন, দিরাইয়ের ৪ জন এবং দোয়ারাবাজারের ১ জন রয়েছেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
২৭ মার্চ, ২০২৬ তারিখে গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের কাছে ২৬ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা ডুবে যায়। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের স্বজনরা পরের দিন শনিবার এই মর্মান্তিক সংবাদটি জানতে পারেন।
জগন্নাথপুরের নিহতরা হলেন পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁও গ্রামের মো. আলী, বাউরি গ্রামের মো. সোহানুর রহমান এবং কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম। তারা দালালদের ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা প্রদান করে গ্রিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
দালাল চক্রের জাল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ভয়াবহ মানবপাচারের পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক দালাল চক্র। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে ছাতক থানার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লালের নাম উঠে এসেছে। স্বজনদের অভিযোগ, বিল্লাল গ্রিসে অবস্থান করে দালালি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন, আর দেশে থেকে দুলাল মিয়া সহজ-সরল যুবকদের ইউরোপের প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন আমিনুর রহমান। দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১১ লাখ টাকা চুক্তিতে তিনি এই বিপদসংকুল পথ বেছে নেন। তবে তিন দিনের মধ্যে গ্রিস পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও দালাল চক্র তাকে দীর্ঘ তিন মাস লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখে।
অমানবিক নির্যাতনের গল্প
এই সময়ের মধ্যে এক মাস তাকে রাখা হয়েছিল কুখ্যাত 'গেমঘরে'। সেখানে তাকে খাবার না দিয়ে উপোস রাখা হতো এবং অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের শ্যালক জাহিদুর রহমান জাহিদ।
সমুদ্রযাত্রার করুণ পরিণতি
গ্রিক কোস্ট গার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ছয় দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তিতে ২২ জনের মৃত্যু হয়।
পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ।
দিরাই ও দোয়ারাবাজারের শোক
দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), কারি ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬) এবং রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০) নিহত হন। দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের ফাহিম নামের আরও একজন যুবক এই ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারান।
সম্প্রদায়ের ক্ষোভ ও দাবি
জগন্নাথপুরের এই পাঁচ যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এই আন্তর্জাতিক দালাল সিন্ডিকেটের হোতা দুলাল ও বিল্লালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন এখনো এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পায়নি, তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি এবং দালাল চক্রের নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। যুবকদের স্বপ্ন ও আশাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই মরণফাঁদে পা দেওয়ার আগে সচেতনতা বৃদ্ধির এখনই সময় বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।



