ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট দুতার্তের বিরুদ্ধে আইসিসিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের শুনানি শুরু
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) শুনানি শুরু হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত এই আদালতে সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টায় চারদিনব্যাপী 'চার্জ কনফার্মেশন' বা অভিযোগ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই শুনানির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে যে দুতার্তের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সংঘটিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করার মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ আদালতের হাতে রয়েছে কিনা।
অভিযোগের বিবরণ ও পটভূমি
৮০ বছর বয়সী রদ্রিগো দুতার্তের বিরুদ্ধে অন্তত ৭৬টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের দাবি অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তিনি দাভাও শহরের মেয়র এবং পরবর্তীতে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন এই অপরাধগুলো সংগঠিত হয়েছে। যদিও বেসরকারি হিসাব ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, তার নেতৃত্বাধীন ছয় বছরের মাদকবিরোধী অভিযানে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজারে পৌঁছাতে পারে, যা একটি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইঙ্গিত বহন করে।
আইসিসি বিচারকগণ দুতার্তেকে শারীরিকভাবে সুস্থ ঘোষণা করলেও তার আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি দ্য হেগের শেভেনিনজেন কারাগারের আটক ইউনিটে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন, যেখানে তিনি আদালতের প্রতি তার অবজ্ঞা ও অসহযোগিতার মনোভাব বজায় রেখেছেন।
দুতার্তের প্রতিক্রিয়া ও আইনি বিতর্ক
বিচারকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে রদ্রিগো দুতার্তে আইসিসির এখতিয়ার মানতে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন এবং নিজের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য প্রকাশ্য গর্ব প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে বর্তমান ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের সহায়তায় তাকে 'অপহরণ' করে নেদারল্যান্ডসে আনা হয়েছে, যা একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন।
উল্লেখ্য, ফিলিপাইন সরকার ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসি থেকে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিলেও আদালতের রায় অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার করার পূর্ণ আইনি অধিকার তাদের রয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলার জন্য নজির স্থাপন করতে পারে।
ভুক্তভোগীদের আশা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
মাদকবিরোধী অভিযানের নামে প্রিয়জন হারানো ভুক্তভোগীদের পরিবার এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই শুনানিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত 'সত্যের মুহূর্ত' হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করছেন যে এই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য কিছুটা সান্ত্বনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
শুনানির পর সিদ্ধান্ত জানাতে বিচারকদের হাতে ৬০ দিনের সময়সীমা বরাদ্দ রয়েছে। এদিকে, আদালতের বাইরে দুতার্তের সমর্থক এবং বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগী—উভয় পক্ষের তীব্র বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, যা এই মামলার প্রতি বৈশ্বিক ও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক মনোযোগের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
এই শুনানি কেবল ফিলিপাইনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
