দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস দুর্ঘটনা: দুজন নিহত, ডুবুরিদের তৎপরতায় উদ্ধার অভিযান
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে বাসটিতে থাকা বেশ কিছু যাত্রী আটকা পড়েন। ডুবুরিদের তৎপরতায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে, তবে বৃষ্টির কারণে কাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে।
ঘটনার বিবরণ ও চালকের ব্যর্থতা
দুর্ঘটনার সময় বাসটি ফেরিঘাটের পন্টুনে ওঠার সড়কে দাঁড়ানো ছিল। ফেরি ঘাটে ভেড়ামাত্র হঠাৎ বাসটি চলতে শুরু করে সরাসরি নদীতে চলে যায়। চালক অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী আবদুস সালাম। তিনি বাস থেকে নেমে বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে যান।
নিহতদের পরিচয় ও পরিবারের শোক
মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হলেন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী রেহেনা আক্তার। তিনি ঢাকার মিরপুরের বাসায় যাচ্ছিলেন তাঁর মেয়ে স্বাভা, ছোট ছেলে রাইয়ান তোতন ও একমাত্র নাতিকে নিয়ে। স্বাভা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক এবং রাইয়ান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনার পর জানালা ভেঙে স্বাভা তাঁর মাকে নিয়ে বেরিয়ে আসলেও রেহেনা আক্তারকে বাঁচানো যায়নি।
রেহেনা আক্তারের ভাই কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আউয়াল আনোয়ার বলেন, 'ঈদের ছুটি শেষে আমার বোন, ছেলে, মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে ঢাকার বাসায় যাচ্ছিলেন। বাসটি নদীতে পড়ে গেলে জানালা ভেঙে আমার বোন ও ভাগনি বের হতে পারলেও অন্যদের বের করতে পারেননি। পরে আমার ভাগনি স্বাভা তাঁর মাকে নিয়ে গোয়ালন্দ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক রেহেনাকে মৃত ঘোষণা করেন।'
অন্যান্য যাত্রীদের অবস্থা ও পরিবারের বিলাপ
কালুখালী উপজেলার মদাপুর থেকে বাসটিতে উঠেছিলেন তরুণ আশরাফুল আলম। তাঁর বাবা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘাটে ছুটে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, 'ছেলে আমার ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসছিল। সে ঢাকার একটি অনলাইনে কাজ করেন। আমার ছেলে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে যায়। এই বিদায় যে তার শেষ বিদায়, তা তো জানতাম না।'
ঘাট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও উদ্ধার প্রচেষ্টা
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন জানান, বিকেল পাঁচটার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি তিন নম্বর ঘাটে আসে। একটি ফেরি ছেড়ে যাওয়ায় বাসটি অপর ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। সোয়া পাঁচটার দিকে 'হাসনা হেনা' নামের একটি ইউটিলিটি ফেরি সজোরে পন্টুনে আঘাত করে, যার ফলে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়।
মনির হোসেন আরও বলেন, 'চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। এ সময় বাসে নারী-শিশুসহ অন্তত ৪০ জন যাত্রী ছিল। ইতিমধ্যে কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েছে।'
সামাজিক মাধ্যম ও চলমান তদন্ত
ফেরির অপেক্ষায় থাকা বাসটি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যা ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরছে। ডুবুরিদের তৎপরতা সত্ত্বেও বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ ঘটনার তদন্ত ও উদ্ধার অভিযান জোরদার করেছে, এবং আহতদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।



