গোয়ালন্দে পদ্মায় বাস দুর্ঘটনা: ২ জনের মৃত্যু, ৩৫ জন নিখোঁজ, উদ্ধারকাজে বাধা
পদ্মায় বাস দুর্ঘটনায় ২ মৃত্যু, ৩৫ নিখোঁজ, উদ্ধারকাজ চলছে

গোয়ালন্দে পদ্মা নদীতে বাস দুর্ঘটনা: মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে এক মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার পর এই দুর্ঘটনা ঘটে। অসুস্থ অবস্থায় গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও একজন। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে বাকি অন্তত ৩৫ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন।

স্বজনদের মর্মন্তুদ বিলাপ ও শোকের ছায়া

মারা যাওয়া ও নিখোঁজদের স্বজনরা ফেরিঘাট এলাকায় জড়ো হয়ে আহাজারি করছেন। যারা সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছেন, তাদের চোখেমুখে এখন কেবল প্রিয়জনকে হারানোর আতঙ্ক আর শোকের ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে। কুষ্টিয়া থেকে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের এক যাত্রী স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে হারিয়ে বিলাপ করছেন, ‘কত করে কইলাম তোমরা বাড়ি থাকো, বউ কইল না তুমি একলা যাইবা। আমার ভালো লাগে না। এখন আমারে ছাইড়া কেমনে একলা রাইখা চইলা গেলা। আমি এখন কী করমু?’। নিখোঁজ স্ত্রী ও শিশুসন্তান আব্দুল্লাহর জন্য বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন এই যাত্রী। তিনি জানান, আগামী ২৯ মার্চ তার কর্মস্থলে ডিউটি থাকায় তিনি একাই ঢাকায় ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্ত্রী স্বামীর সঙ্গ ছাড়তে চাননি। সেই ভালোবাসাই আজ কাল হয়ে গেল।

দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা যাত্রীদের ভাষ্যমতে, বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ৩ নম্বর পন্টুন দিয়ে ফেরিতে উঠতে গেলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। মুহূর্তে বাসটি উল্টে নদীতে পড়ে তলিয়ে যায়। বাসে থাকা ৪৫ জন যাত্রীর মধ্যে কয়েকজন তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। মারা যাওয়া দুজন হলেন রেহেনা বেগম (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫)। রেহেনার বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়, অন্যদিকে মর্জিনা বেগমের বিস্তারিত পরিচয় এখনও অজানা। চিকিৎসাধীন নুসরাত (২৯) নামের এক নারী পেশায় একজন চিকিৎসক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উদ্ধারকাজে বাধা ও প্রশাসনের তৎপরতা

গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘বাস দুর্ঘটনায় তিন জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স তলিয়ে যাওয়া বাসটি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীর আনুমানিক ৩০ ফুট গভীরে তলিয়ে গেছে। তবে বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। গোয়ালন্দ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের একটি ইউনিট এবং আরিচা স্টেশনের একটি ডুবুরি ইউনিট উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে আরও দুটি ডুবুরি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাচ্ছে।

ঘটনার পেছনের কারণ ও উত্তেজনা

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন জানান, বিকাল ৫টার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য তাতে উঠতে না পারায় অপর ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামক একটি ইউটিলিটি ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, বাসটি পন্টুনের নিচে আছে, যার কারণে বাসটির দরজা ও জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে পারছেন না। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।

ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা এসে পৌঁছালেও এখনও উদ্ধার অভিযান শুরু করতে পারেনি। এতে নিখোঁজদের স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা অবস্থান করছেন। স্থানীয় ও বেঁচে যাওয়া বাসের যাত্রীদের ভাষ্যমতে, ওই বাস থেকে পাঁচ থেকে সাত যাত্রী শুরুতেই বের হতে পেরেছেন, বাকিরা নিখোঁজ রয়েছেন। অন্তত ৪০ জন নিখোঁজ আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।