ভারতের মাটির নিচে স্বর্ণের পাহাড়, তবুও আমদানির ওপর নির্ভরতা কেন?
ভারতের স্বর্ণের পাহাড়, তবুও আমদানির ওপর নির্ভরতা

ভারতের মাটির নিচে স্বর্ণের পাহাড়, তবুও আমদানির ওপর নির্ভরতা কেন?

ভারতের মাটির গভীরে প্রায় ৫০ কোটি টন স্বর্ণ আকরিক জমা হয়ে আছে, যা একটি বিশাল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। অথচ এক অদ্ভুত বাস্তবতা হলো, এই বিপুল সম্পদের ওপর বসে থেকেও ভারত প্রতি বছর বিদেশ থেকে কয়েকশ টন স্বর্ণ আমদানি করে চলেছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে প্রখ্যাত রাজনীতিক ও লেখক শশী থারুর এই বিষয়টিকে ভারতের জন্য একটি 'স্বেচ্ছায় নেওয়া ক্ষত' হিসেবে অভিহিত করেছেন।

স্বর্ণের চাহিদা ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৈপরীত্য

শশী থারুরের মতে, ভারত এমন একটি দেশ যেখানে স্বর্ণ শুধুমাত্র অলংকার নয়, বরং আধ্যাত্মিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরীণ স্বর্ণ উৎপাদন বছরে মাত্র দেড় টনের মতো, যা বিশ্ববাজারের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ফলে অস্ট্রেলিয়া, ঘানা বা পেরুর মতো দেশগুলো থেকে স্বর্ণ কিনতে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

ভারতের খনি শিল্প পিছিয়ে পড়ার কারণসমূহ

শশী থারুর ভারতের খনি শিল্প পিছিয়ে পড়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: ভারতের বর্তমান খনন নীতি অত্যন্ত প্রাচীন ও জটিল। একটি খনি চালু করতে যে পরিমাণ আইনি প্রক্রিয়া ও ছাড়পত্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা বিনিয়োগকারীদের জন্য একপ্রকার দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
  • অতিরিক্ত কর ও রয়্যালটি: ভারতে খনি খাতের ওপর করের হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। এই উচ্চ করের বোঝা মাটির গভীর থেকে স্বর্ণ তোলা অনেক কোম্পানির কাছে লাভজনক মনে হয় না, ফলে তারা এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।
  • পুরোনো মানসিকতা: সরকারকে খনিজ সম্পদ নিয়ে 'সংরক্ষণবাদী' মানসিকতা ত্যাগ করে 'উদ্যোক্তা' মানসিকতা গ্রহণ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যই ভারতের খনি শিল্পের প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।

সমাধানের জন্য প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ

প্রতিবেদনে থারুর বেশ কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা ভারতের খনি শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারে:

  1. একক জানালা বা 'সিঙ্গেল উইন্ডো' ক্লিয়ারেন্স: ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে, যাতে তারা নিরাপদ বিনিয়োগ করতে পারে।
  2. কর ছাড়: প্রাথমিক পর্যায়ে কোম্পানিগুলোকে বড় অংকের ট্যাক্স হলিডে বা কর ছাড় দিতে হবে, যাতে তারা উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্বর্ণ উত্তোলন করতে সক্ষম হয়।
  3. পরিবেশবান্ধব খনন: অবৈধ বা মানহীন খনির বদলে বৈশ্বিক বড় সংস্থাগুলোকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব দিলে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করেই স্বর্ণ তোলা সম্ভব। এতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে।

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অস্থির সময়ে স্বর্ণ হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে। ভারতের মাটির নিচের এই সম্পদকে যদি সম্পদে রূপান্তর করা না যায়, তবে দেশটিকে বিদেশের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হবে। শশী থারুরের ভাষায়, 'ভারতের মাটি সম্পদশালী, কিন্তু দেশের নীতি দরিদ্র।' এখনই সময় এই লুকানো সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ভারতের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা। এই সংস্কারগুলি বাস্তবায়িত হলে ভারত তার স্বর্ণ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে।