বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর এক গবেষণায় এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে, যা দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মূল্যস্ফীতির চাপ ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের শঙ্কা
সানেমের হিসাব বলছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাবে। ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমতে পারে। এটি মূলত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্লেষণ তৈরি করেছে সানেম।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও জ্বালানিসংকটের গভীরতা
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের মধ্যকার যুদ্ধ জ্বালানি উত্পাদন, তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল এবং আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানিসংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সাপ্লাই চেইনের ওপর দেশের চরম নির্ভরশীলতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত বিশ্বের অন্তত ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ এখন ঝুঁকির মুখে। সাম্প্রতিক হামলার কারণে কাতার এলএনজি উত্পাদন বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানিসংকট আরো গভীর হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই বৈশ্বিক অচলাবস্থা বিশেষভাবে ভয়াবহ, কারণ দেশের ৭২ শতাংশ এলএনজি আমদানি আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এবং এই সমুদ্রপথ বর্তমানে অচল।
বিভিন্ন খাতে উত্পাদন হ্রাসের সম্ভাবনা
সানেম নিজস্ব গবেষণায় মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি প্রধান ট্রান্সমিশন চ্যানেল চিহ্নিত করেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এই তিনটি চ্যানেল হলো জ্বালানি, রেমিট্যান্স, বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থা। জ্বালানি চ্যানেলটি নির্দেশ করে যে, যেহেতু বাংলাদেশ আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাই তেল ও গ্যাসের দামের অস্থিতিশীল ও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেশের আমদানি ও উত্পাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
এই ধাক্কার অসম প্রভাব বিভিন্ন খাতের পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট, যেখানে তৈরি পোশাক খাতের উত্পাদন প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ, পরিবহন খাতে প্রায় ৩ শতাংশ এবং কৃষি উত্পাদন প্রায় ১ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি-নিবিড় উত্পাদন খাতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পতন হতে পারে।
সরকারি পদক্ষেপ ও সুপারিশ
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদিকে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিংয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে সরকারি বার্তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সুস্পষ্ট অমিল রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি সানেমের কিছু সুপারিশ রয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, জমি এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সবচেয়ে সহজলভ্য ও কার্যকর বিকল্পের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এছাড়া, সরবরাহের ক্ষেত্রে ধাক্কাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশীয় গ্যাস উত্পাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ আগে থেকে কাঠামোগত গ্যাস ঘাটতিতে রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।



