বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা: যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশে নতুন ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে
বিশ্বব্যাংক: যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে নতুন ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে

বিশ্বব্যাংকের হুঁশিয়ারি: যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশে নতুন ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে চলতি বছর বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয় হ্রাসের কারণে এদের বড় একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে না।

প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য

বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট (এপ্রিল ২০২৬) প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির কর্মকর্তারা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে কোনও কর্মক্ষম ব্যক্তি দিনে তিন ডলারের কম আয় করলে তাকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছরে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবেন। তবে যুদ্ধের কারণে সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। ফলে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে না পেরে দরিদ্র হিসেবেই থেকে যাবেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দারিদ্র্য হ্রাসের গতি মন্থর

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্য কমার গতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, "বাংলাদেশে প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কয়েক বছর ধরে কমে এসেছে।" টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো অব্যাহত রাখা জরুরি। যদিও এসব সংস্কার বাস্তবায়ন সহজ হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত স্বল্পমেয়াদি নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ছয় খাতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্তত ছয়টি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে:

  • চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হওয়া
  • আমদানি–রফতানি, রেমিট্যান্স ও বিনিময় হারে প্রভাব
  • ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া
  • জ্বালানি তেল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি
  • প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি
  • সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ায় সরকারের আর্থিক চাপ বৃদ্ধি

আয়বৈষম্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলে ২০২৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারত। এছাড়া ২০২৬ সালে গিনি সূচক প্রায় ০ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা আয়বৈষম্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্বব্যাংক মনে করছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা গেলে দারিদ্র্য কমানোর গতি আবারও বাড়ানো সম্ভব হবে। সংস্থাটি বাংলাদেশের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য জরুরি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছে।