ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সুযোগে ইরান-চীন ডলারের আধিপত্য মোকাবিলায় একজোট
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধ দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত হলেও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইরান ও চীন বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের আধিপত্য মোকাবিলায় একজোট হয়েছে। তাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটানো। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর নিশ্চিত করেছে।
ডলারের বিরুদ্ধে ইরান-চীনের যৌথ কৌশল
দীর্ঘদিন ধরে তেহরান ও বেইজিংয়ের অভিযোগ, ওয়াশিংটন ডলারের প্রভাব খাটিয়ে শত্রু ও প্রতিযোগীদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চলেছে। জেপি মরগান চেসের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল বাণিজ্যের ৮০ শতাংশই ডলারে সম্পন্ন হয়। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে বেইজিং ও তেহরান ডলারের বিকল্প হিসেবে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’ বা ‘রেনমিনবি’কে প্রতিষ্ঠিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে ইউয়ানের মাধ্যমে ট্রানজিট ফি বা শুল্ক আদায় করছে। লয়েডস লিস্টের তথ্যমতে, গত ২৫ মার্চের মধ্যে অন্তত দুটি জাহাজ ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইউয়ানে পেমেন্ট করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গত শনিবার জিম্বাবুয়েতে অবস্থিত ইরান দূতাবাস জানায়, এখন বিশ্ব বাজারে ‘পেট্রোইউয়ান’ যুক্ত করার সময় এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেন, ‘একদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চোখে আঙুল দিয়ে অপমান করতে চাইছে, অন্যদিকে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউয়ান ব্যবহার নিয়ে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে।’ কিল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক বুলেন্ত গোকে বলেন, ‘ইরান মার্কিন আর্থিক আধিপত্য ও পেট্রোডলারের গুরুত্ব বোঝে। চীনের জন্য এটি একটি বহুমুখী আর্থিক বিশ্ব তৈরির সুযোগ, যেখানে ডলারের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।’
বর্তমানে ইরানের তেল রফতানির ৮০ শতাংশেরই ক্রেতা চীন। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের অধীনে এই বাণিজ্য আরও বেড়েছে। যুদ্ধের মধ্যেও দুই দেশের তেল বাণিজ্যে কোনও ভাটা পড়েনি। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান ১২ থেকে ১৩.৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রফতানি করেছে, যার সিংহভাগই গেছে চীনে। ২০২৪ সালে এক ভাষণে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইউয়ানকে বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
ডলারের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ডলারকে হঠানো সহজ কাজ নয়। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক রিজার্ভের ৫৭ শতাংশই এখনও ডলার, যেখানে ইউয়ানের অংশ মাত্র ২ শতাংশ। এ ছাড়া ইউয়ান এখনও ডলারের মতো অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয় এবং বেইজিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এর বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতায় বাধা সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, এটি এখনই বিশ্বকে ডলারমুক্ত করতে পারবে না। বড় পরিবর্তন আনতে হলে সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তবে ব্রাসেলসের ইউরোপীয় সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির ডিরেক্টর হোসুক লি-মাকিয়ামা মনে করেন, চীন যেহেতু বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদন কেন্দ্র, তাই ইরানের প্রয়োজনীয় সব শিল্পপণ্য চীন থেকেই মেটানো সম্ভব। এর ফলে ডলার ছাড়াও তাদের বাণিজ্য নিরবচ্ছিন্ন থাকবে। কেন রোগফ মনে করেন, এই যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হয় তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। যদি ইরান ও চীন সফল হয়, তবে অনেক দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে ডলার থেকে দূরে সরে যাবে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়, তবে ডলারের আধিপত্য আরও কিছুকাল টিকে থাকবে।



