বিশ্ব ব্যাংকের হুঁশিয়ারি: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, দারিদ্র্য বাড়ছে
বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে দেশের অর্থনীতির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব ব্যাংক আরও দুঃসংবাদ দিয়েছে এবং প্রবৃদ্ধি আরও কমার পূর্বাভাস দিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি।
প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নামার পূর্বাভাস
বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে তিন দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত চলতে থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একাধিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
- জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি
- ভর্তুকি বাড়ায় সরকারের রাজস্ব চাপ বৃদ্ধি
- আমদানি ব্যয় বাড়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ
- রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলকভাবে সীমিত। একইসঙ্গে কঠোর রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত।
মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশ এবং দারিদ্র্য বাড়ছে
চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি আট দশমিক পাঁচ শতাংশ থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি বেশি রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক সাত শতাংশ। তা বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ২১ দশমিক চার শতাংশ। অর্থাৎ, তিন বছরে দারিদ্র্যের হার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ২০২৫ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ লাখ মানুষ চলে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত না হলে চলতি বছরে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতো। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাত বড় ঝুঁকিতে
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখনও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বলা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ছয় শতাংশে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে গেছে। ফলে অনেক ব্যাংকের ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি, তবে রফতানিতে ঝুঁকি
বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ২০২৫ অর্থবছর এবং ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমেছে। এর পেছনে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিনিময় হার আরও নমনীয় করা হওয়ায় টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে। তবে, রফতানি এখনও বৈশ্বিক ধাক্কার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) খুবই কম রয়েছে।
রাজস্ব আহরণে বড় দুর্বলতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সাত শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, এতো কম রাজস্ব আহরণের ফলে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো অগ্রাধিকার খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না।
বেসরকারি খাতের সামনে নানা বাধা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মূলত কিছু বড় রফতানিমুখী শিল্প—বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত—নির্ভর। কিন্তু, অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- জটিল বিধিনিষেধ
- দুর্বল অবকাঠামো
- বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা
- অর্থায়নের সীমিত সুযোগ
বিশ্ব ব্যাংকের মতে, লক্ষ্যভিত্তিক বিধিনিষেধ শিথিল করা, প্রতিযোগিতা নীতি শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি এবং বাণিজ্য নীতিকে সহজ করা হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে।
দ্রুত সংস্কারের আহ্বান
বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বলেন, “বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পেছনে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে, রাজস্ব ব্যবস্থা, আর্থিক খাত এবং ব্যবসা পরিবেশে দ্রুত সংস্কার না হলে এই স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখা কঠিন হবে।” তিনি আরও বলেন, “শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে এখনই সাহসী ও দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।”
প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক ও বিশ্ব ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, “ব্যবসা পরিবেশ উন্নত করা প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং ব্যবসার সম্প্রসারণে বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধিও কমবে
একই দিনে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কমে ছয় দশমিক তিন শতাংশে নামতে পারে, যা ২০২৫ সালে ছিল সাত শতাংশ। তবে, ২০২৭ সালে তা আবার ছয় দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, “বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা শক্তিশালী রয়েছে। তবে, প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য বাধা কমানো, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো নীতি সংস্কার জরুরি।”



