বকেয়া বেতন ও চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টিকা বহনকারীদের অবস্থান
বকেয়া বেতনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টিকা বহনকারীদের অবস্থান

বকেয়া বেতনসহ চাকুরি স্থায়ীকরণের দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচী পালন করেছেন জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে কর্মরত ২৭ জন টিকা বহনকারী। আজ সকাল ১০টার দিকে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস বন্ধ

মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ছয় সদস্যের সংসার নাহিদ মিয়ার। সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস তাঁর টিকা বহনকারীর চাকরি। কিন্তু ১০ মাস ধরে বেতন বন্ধ। ধারদেনা করে চলছে সংসার, এ অবস্থায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে দুই সন্তানের পড়াশোনা। শুধু নাহিদ নন, জেলার আরও ২৬ জন টিকা বহনকারী একই অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

নাহিদ মিয়ার পরিবারের অবস্থা

নাহিদ মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে টিকা বহনকারী (পোর্টার) হিসেবে কাজ করেন। তিনি জেলা শহরের পূর্ব মেড্ডা এলাকার বাসিন্দা। পরিবারে আছেন বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী নিপা আক্তার এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলে নাঈমুল ইসলাম ও মেয়ে নাজিয়া আক্তার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আক্ষেপ নিয়ে নাহিদ মিয়া বলেন, ‘১০ মাস ধরে বেতন বন্ধ থাকলেও কেন্দ্রে নিয়মিত টিকা পৌঁছে দিচ্ছি। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করছি, কিন্তু বেতন পাচ্ছি না। সংসার চালাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।’

বকেয়া বেতনের বিবরণ

নাহিদ মিয়া জানান, সর্বশেষ ২০২৫ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ইউনিসেফের অর্থায়নে প্রতি মাসে ১৭ হাজার টাকা করে বকেয়া বেতন পান। তবে টিকা পরিবহনের জন্য নির্ধারিত ৩০০ টাকা ভাতা পাননি। বর্তমানে তিনি তিনটি ইউনিয়নে টিকা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২৭ জন টিকা বহনকারীর অবস্থা

সিভিল সার্জন কার্যালয় ও পোর্টারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীন ২৭ জন টিকা বহনকারী অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। তাঁদের কেউ কেউ ১৫ থেকে ২৫ বছর ধরে এ দায়িত্ব পালন করছেন। নির্দিষ্ট দিনে তাঁরা টিকা সংগ্রহ করে ক্যারিয়ার বা বক্সে করে বিভিন্ন আউটরিচ কেন্দ্রে পৌঁছে দেন।

জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্ব

দেশে বর্তমানে ১০ ধরনের টিকা দেওয়া হয়। শূন্য থেকে দুই বছর বয়সী শিশু এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী সন্তান ধারণক্ষম নারীরা এই কর্মসূচির আওতায় আছেন। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও ১০ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না এসব কর্মী।

পোর্টার সমিতির সভাপতির বক্তব্য

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পোর্টার সমিতির সভাপতি ও সদর উপজেলার নাটাই গ্রামের বাসিন্দা শামীম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধারদেনা করে, এই দোকান–ওই দোকান থেকে বাকি এনে দিন কাটাচ্ছি। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে দৈন্যদশায় পড়েছি। ১০ মাস ধরে বেতন বন্ধ। সন্তান লিচু খেতে চাইছে, কিন্তু হাতে টাকা নেই যে কিনব।’

স্মারকলিপি ও বকেয়া পরিমাণ

চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বকেয়া বেতনের দাবিতে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন টিকা বহনকারী কর্মীরা। স্মারকলিপি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাস প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা করে এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাত মাস প্রতি মাসে ১৬ হাজার ৮০০ টাকা করে বেতন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই ১০ মাসের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ করা হয়নি।

ইপিআই কর্মসূচির সম্প্রসারণ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সময়ের সঙ্গে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পরিধি বেড়েছে। নতুন নতুন টিকা ও কর্মসূচি যুক্ত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে পোলিও নির্মূল ও মাতৃ-নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল কর্মসূচি, ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস বি টিকা, ২০১২ সালে এমআর টিকা ও হামের দ্বিতীয় ডোজ এবং ২০১৫ সালে পিসিভি ও আইপিভি টিকা চালু হয়। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন পোর্টাররা।

সিভিল সার্জনের বক্তব্য

টিকা বহনকারীদের মানবেতর জীবন কাটানোর বিষয়টি স্বীকার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন নোমান মিয়া বলেন, ‘প্রথমে কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ পান। পরে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্পের অধীনে কাজ করছিলেন। কিন্তু প্রকল্পটি দুই বছরের বেশি সময় আগে বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন খাত থেকে তাঁদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করেছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। অর্থ ছাড় হলে বকেয়া পরিশোধ করা হবে।’