বৃষ্টির পানি পান করা কি নিরাপদ? জানুন সিডিসি ও গবেষণার বক্তব্য
বৃষ্টির পানি পান করা কি নিরাপদ? জানুন সিডিসি ও গবেষণার বক্তব্য

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংস্থা ‘সিডিসি’ বলছে, বৃষ্টির পানি সরাসরি পান করা একদমই ঠিক নয়। কারণ, মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়ার সময় বাতাসে থাকা নানা রকম ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ধুলাবালু আর ধোঁয়া পানির সঙ্গে মিশে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যখন ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে বৃষ্টির পানি বালতি বা ট্যাংকে জমানো হয়। ছাদে পাখির মল বা অন্য ময়লা থাকলে তা পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। ছাদ বা পাইপ পুরোনো হলে সেখান থেকে সিসা বা তামার মতো বিষাক্ত ধাতুও পানিতে চলে আসতে পারে। খোলা পাত্রে পানি জমিয়ে রাখলে মশা ডিম পাড়তে পারে, গাছের শুকনো পাতা পচে পানি নষ্ট হয়। এসব বিপদের কারণে বিজ্ঞানীরা বৃষ্টির পানি সরাসরি পান করতে বারণ করেন। তবে এই পানি গাছে দেওয়া যায়।

বৃষ্টির পানিতে পিএফএএসের বিপদ

২০২২ সালের আগস্টে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে বৃষ্টির পানিতে বিষাক্ত ‘পিএফএএস’ (PFAS)-এর পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। গবেষণার প্রধান লেখক ও সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ রসায়নবিদ ইয়ান কাজিনস জানান, পিএফএএস হলো মানুষের তৈরি ১ হাজার ৪০০টির বেশি রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণ। এগুলো সাধারণত ওয়াটারপ্রুফ পোশাক, ননস্টিক রান্নার হাঁড়ি-পাতিল, খাবারের প্যাকেট এবং কৃত্রিম ঘাস তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ৪টি উপাদান মানুষের শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

পিএফএএসের স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষণায় দেখা গেছে, এই রাসায়নিকগুলো অত্যন্ত বিষাক্ত। এগুলো শরীরে প্রবেশ করলে ক্যানসার, লিভার ও থাইরয়েডের রোগ এবং শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি শিশুদের টিকার কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। গত ২০-৩০ বছরে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই এই রাসায়নিকগুলো নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। আমেরিকার পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) নিরাপদ পানির জন্য এই রাসায়নিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা আগের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ কোটি গুণ কমিয়ে দিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পিএফএএসের স্থায়িত্ব ও বিস্তার

বিজ্ঞানী ইয়ান কাজিন্স জানান, পিএফএএস রাসায়নিকগুলো সহজে ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যায় না। এগুলো তৈরি হওয়ার বহু বছর পরও পরিবেশে টিকে থাকে এবং আগের মতোই বিষাক্ত থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী স্বভাবের কারণেই বিজ্ঞানীরা একে চিরস্থায়ী রাসায়নিক বলে ডাকেন। গবেষকেরা বিশ্বজুড়ে বৃষ্টির পানির নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে পৃথিবীর সব জায়গার বৃষ্টির পানিতেই এখনো প্রচুর পরিমাণে পিএফএএস মিশে আছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করেছিলেন নিষেধাজ্ঞার কারণে পিএফএএসের পরিমাণ কমবে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। গবেষকেরা মনে করেন, এই রাসায়নিকের কারণে আমরা ইতিমধ্যেই পৃথিবীর নিরাপদ সীমার বাইরে চলে গেছি, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বড় হুমকি।

দূরবর্তী অঞ্চলেও পিএফএএসের উপস্থিতি

অবাক করা বিষয় হলো, তিব্বত মালভূমি এবং অ্যান্টার্কটিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রত্যন্ত ও নির্জন এলাকার বৃষ্টির পানিতেও বিষাক্ত পিএফওএ (PFOA)-এর মাত্রা ইপিএর নিরাপদ সীমার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকেরা ধারণা করেন, সমুদ্রের পানিতে মিশে থাকা পিএফএএস পানিকণার মাধ্যমে বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে চলে যায়, পরে তা মেঘের সঙ্গে ভেসে দূরদূরান্তে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ে। এ ছাড়া ল্যান্ডফিল বা ময়লা ফেলার স্থান থেকেও এই রাসায়নিক চুইয়ে পরিবেশে মিশে যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বিশ্বজুড়ে পিএফএএস–সমৃদ্ধ বৃষ্টির পানি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ সেখানকার লাখ লাখ মানুষের পানির একমাত্র উৎস হিসেবে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে। উন্নত দেশগুলোর কিছু অঞ্চলেও, যেমন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায়, বৃষ্টির পানি পান করার চল এখনো জনপ্রিয়।

পিএফএএস দূর করা কি সম্ভব?

বৃষ্টির পানি ফুটিয়ে বা সাধারণ উপায়ে শোধন করলেও তা থেকে পিএফএএস পুরোপুরি দূর করা যায় না। এমনকি ঘরের পানি এবং বোতলজাত পানিতেও খুব সামান্য পরিমাণে পিএফএএস পাওয়া যেতে পারে, যদিও তা সাধারণত নিরাপদ সীমার ভেতরেই থাকে। এই রাসায়নিকগুলো একসময় নদী-নালা হয়ে গভীর সমুদ্রে চলে গেলে ধীরে ধীরে এর ঘনত্ব ও ক্ষতিকর প্রভাব কমে আসবে। তবে এটি অত্যন্ত ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া, যা সফল হতে আরও বহু দশক সময় লেগে যেতে পারে।