সম্প্রতি দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। আসক বলছে, পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ওই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা
আসক মনে করে, এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সামাজিক জবাবদিহির সংকটের প্রতিফলন। আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত কমপক্ষে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৪৬ শিশু। এছাড়া ধর্ষণ পরবর্তী এবং ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কমপক্ষে ১৭ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
সংবিধান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে শিশুদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত শিশুদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো একদিকে যেমন গভীর শোক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, অন্যদিকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আস্থাও অনেক সময় প্রশ্ন তুলতে পারে।
দ্রুত বিচার ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান
আসক মনে করে, শিশু নির্যাতন ও হত্যার প্রতিটি ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে তদন্ত কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি, যাতে কোনও ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।
শিক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাসস্থান এবং ডিজিটাল পরিসরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আসক মনে করে, শিশুদের সুরক্ষা কোনও নীতিগত অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, মানবাধিকারের মৌলিক শর্ত এবং সভ্য সমাজের ন্যূনতম মানদণ্ড। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা শুধু আইনগত ব্যর্থতাই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও মানবিক অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।



