কুমিল্লার বাস-ট্রেন সংঘর্ষে নিহতদের লাশঘরে স্বজনদের অপেক্ষা ও বিলাপ
কুমিল্লার বাস-ট্রেন সংঘর্ষে নিহতদের লাশঘরে স্বজনদের বিলাপ

কুমিল্লার বাস-ট্রেন সংঘর্ষে নিহতদের লাশঘরে স্বজনদের অপেক্ষা ও বিলাপ

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমায়িত লাশ ঘরের সামনে আজ এক করুণ দৃশ্য। রোববার দুপুরে এখানে জমে উঠেছে নিহতদের স্বজনদের ভিড়, অপেক্ষা আর মর্মস্পর্শী আহাজারি। কারণ, এই ঘরেই রাখা হয়েছে কুমিল্লায় লেভেল ক্রসিংয়ে বাসের সঙ্গে ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে নিহত ১২ জনের মরদেহ।

দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

ঈদের দিন শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ ঘটে। এতে প্রাণ হারান সাতজন পুরুষ, দুই নারী এবং তিন শিশুসহ মোট ১২ জন। গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন, যারা সবাই বাসটির যাত্রী ছিলেন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত গেটম্যানের দায়িত্বহীনতায় এ ঘটনা ঘটেছে। এর জন্য ওই ক্রসিংয়ে দায়িত্বরত দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বজনদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পাতিবিলা গ্রামের বাসিন্দা পিন্টু ইসলাম, যিনি নিজেও মামুন পরিবহনের বাস চালক, এই দুর্ঘটনায় স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬) এবং দুই কন্যা খাদিজা আক্তার (৬) ও মরিয়ম আক্তার (৩)-কে হারিয়েছেন। পিন্টু ইসলাম রোববার দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের সামনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার শ্যালক বিদেশ থেকে আসবে। আমি তাকে রিসিভ করে পরে শ্বশুরবাড়ি যাব। এ জন্য রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা নেমে গেছিলাম। ভোর ৪টার দিকে খবর পাই গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করছে। প্রথমে ঘটনাস্থল এবং পরে হাসপাতালে এসে দেখি আমার স্ত্রী আর সন্তানদের নিথর দেহ। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘কুমিল্লায় এসে জেনেছি ঘটনার সময় ব্যারিয়ার ফেলা হয়নি, যার কারণে বাস ট্রেনের লাইনে চলে আসে। আমি বলব এইটা হত্যা, এইটা দুর্ঘটনা না। রেল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে ১২ জন মানুষের প্রাণ গেছে। আমরা এর বিচার চাই।’

অন্যান্য নিহতদের পরিবারের করুণ অবস্থা

ঝিনাইদহ সদরের গোপাল পানানিয়া এলাকার বাসিন্দা মোক্তার বিশ্বাসের ছেলে জুহাদ বিশ্বাস (২৪) এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী রুমি আক্তার, সঙ্গে দেড় বছরের শিশু মরিয়ম, হাসপাতালের লাশঘরের সামনে স্বামীর জন্য বিলাপ করছিলেন। রুমি আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী বিদেশে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিল। কিন্তু কে জানতে এভাবে সব শেষ হয়ে যাবে। যাদের অবহেলায় এত প্রাণহানি হয়েছে, আমরা তাদের বিচার চাই। আমার ছোট্ট মেয়েটা ভালোভাবে বাবা ডাকার আগেই তাঁর বাবাকে হারাল।’

নিহত ৯ বছর বয়সী শিশু সাঈদার লাশ নিতে এসেছেন তাঁর খালা শাহিদা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সকালে এক অ্যাম্বুলেন্সচালক আমাদের কল করে বিষয়টি জানায়। এরপর আমি দ্রুত কুমিল্লায় আসি। কত সাজানো একটি পরিবার আমার বোনের। এক নিমেষেই যেন সব শেষ হয়ে গেল।’ সাঈদার বাবা সিরাজউদ্দৌলা, মা এবং অপর বোন আফনান আক্তার গুরুতর আহত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নিহতদের তালিকা ও পরবর্তী অবস্থা

এই দুর্ঘটনায় নিহত অন্যান্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার সিরাজুল ইসলাম (৭০) ও তাঁর স্ত্রী কোহিনুর বেগম (৫৫), চাঁদপুরের তাজুল ইসলাম (৬৭), নোয়াখালীর বাবুল চৌধুরী (৫৫), মাগুরার ফচিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার সোহেল রানা (২৫) এবং নোয়াখালীর নজরুল ইসলাম ওরফে রায়হান (৪৫)।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্বজনরা প্রিয়জনদের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন, কিন্তু তাদের মনের ব্যথা আর ক্ষোভ দীর্ঘদিন রয়ে যাবে।