প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং করপোরেশনের আরও পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। মশক নিধন শেখার জন্য ফ্লোরিডায় যাওয়ার এই প্রস্তাব নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ হাতে ফাইলে মন্তব্য করেন, ‘মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই। দেশেই সন্ধ্যার পর যে কোনো ডোবার পাশে দুই-তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশক নিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।’
বিতর্কিত প্রস্তাব ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
‘মশা মারা শিখতে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার প্রস্তাবকে ‘মশা মারতে কামান দাগানোর’ মতো বলেই মন্তব্য করেছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। চসিক মেয়র তার ফেসবুক আইডিতে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় একটি বিবৃতি প্রদান করেন। যুক্তরাষ্ট্র সফর নাকচ করা প্রসঙ্গে এই বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মশক নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে আমি তা সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সবসময় সরকারের নীতিমালা, আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ভবিষ্যতেও সে ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।’
বিবৃতি ও ভুয়া পোস্টের ঘটনা
এর আগে সকালে চসিক মেয়রের নামে একটি ফেসবুক আইডিতে একটি বক্তব্য পোস্ট করা হয়। ওই পোস্টে বলা হয় ‘সব প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত ঠিক তখনই একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এ সফরের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভুল, মিথ্যা ও বিভ্রান্তির তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে। ফলে দেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এই যাত্রাটি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’ এই পোস্টে মশক নিধনে যুক্তরাষ্ট্র সফর সংক্রান্ত প্রস্তাবের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়। তবে সন্ধ্যায় প্রদত্ত বিবৃতিতে ডা. শাহাদাত বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভেলেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির আমন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কয়েকজন কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র সফর প্রসঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নামে নানা ধরনের সংবাদ ও মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব বক্তব্য বা মন্তব্য তার নয়। তিনি এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া প্রদান করেননি। সন্ধ্যায় তার ফেসবুক আইডিতে প্রচারিত এ বক্তব্যটি ঠিক আছে কিনা তা জানার জন্য ডা. শাহাদাত হোসেনের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রস্তাবের পটভূমি ও অর্থনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা
চসিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতি বছর মশার লার্ভা নিধনে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার কেমিক্যাল আমদানি করা হয়। ভেলেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসি নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানির উৎপাদিত কেমিক্যাল গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত আট মাস লার্ভা নিধনে ব্যবহার করা হয়। বিদেশ থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার কেমিক্যাল আমদানির নির্ভরতা কমাতে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের ওই কোম্পানিকে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব দেন। এতে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশে কারখানা করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি চসিক মেয়রের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ফ্লোরিডা রাজ্যে তাদের মূল কারখানা ও ল্যাব পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানায়। এ সফরের সব খরচ কোম্পানি বহন করবে বলেও জানায়। মূলত এর পরিপ্রেক্ষিতে মশক নিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা সফরের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়।
প্রস্তাবিত প্রতিনিধিদল ও প্রস্তাব ফেরতের কারণ
যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য মেয়র শাহাদাত হোসেন অন্য যে পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করেন, তারা হলেন- করপোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী এবং ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। তবে কারখানা বা ল্যাব পরিদর্শনের জন্য সাধারণত ‘টেকনিক্যাল পারসন’দের প্রস্তাব করার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে চারজনই ‘নন টেকনিক্যাল’ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ওই প্রস্তাব ফেরত পাঠানো সংক্রান্ত একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ঠিকাদারি/সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করতে হবে মর্মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ কারণে ভেলেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির আমন্ত্রণে চসিক মেয়র ও পাঁচ কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ব্যক্তিগত সফরের উদ্দেশ্যে কানাডা সফরের অনুমতি প্রদান ব্যতিরেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সারসংক্ষেপটি ফেরত প্রদান করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগ- সিটি করপোরেশন-২ শাখার উপ-সচিব আশফিকুন নাহার ২৪ মে এ সংক্রান্ত চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ও সামাজিক প্রশংসা
সূত্র জানায়, এর আগে প্রস্তাবটি পর্যালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফাইলেই নিজ হাতে লিখে এই মর্মে মতামত দেন যে- ‘মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের যেকোনো স্থানে সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে দুই/তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশক নিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর নিজ হাতে লেখা এই মতামত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে প্রশংসার ঝড় বয়ে যায়। তারা বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের নামে এভাবে মন্ত্রী-মেয়র, এমপি বা সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশে বিলাস ভ্রমণ করেন। এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারের রাজস্বের অপচয় হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথাযথ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে লেখা এ মন্তব্যটির সত্যতা নিশ্চিত করে নিজ আইডিতে পোস্ট করেন আল-জাজিরার আলোচিত সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়েরও।



