টাঙ্গাইলে পথশিশু সিয়ামের করুণ অবস্থা: হাসপাতালের বেডে নিঃসঙ্গ, পরিবারের খোঁজ নেই
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের ৭নং ওয়ার্ডের একটি বেডে নিঃসঙ্গ পড়ে আছে ১১ বছর বয়সী পথশিশু সিয়াম। ট্রেনে পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা এই শিশুটির জীবন এখন বিপন্ন। ঘুমন্ত অবস্থায় ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে তার পায়ের হাড় ভেঙে গেছে, আর তার পরিবারের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
ট্রেনে পানি বিক্রি করত সিয়াম
সিয়ামের দৈনন্দিন জীবন ছিল রেলস্টেশনকেন্দ্রিক। ট্রেন এলে দৌড়ে উঠত এক বগি থেকে আরেক বগিতে। যাত্রীদের কাছে ‘পানি লাগবে?’ – এই ডাকই ছিল তার জীবিকার একমাত্র ভাষা। রেললাইনের কোলাহল আর ট্রেনের হুইসেলের শব্দই ছিল তার প্রতিদিনের সঙ্গী। কিন্তু সেই ট্রেনই যেন কেড়ে নিল তার শৈশবের স্বাভাবিক চলার পথ।
হাসপাতালে নিঃসঙ্গ অবস্থা
শনিবার বিকালে সাতুটিয়া এলাকা থেকে স্থানীয়রা সিয়ামকে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে সিয়ামের পাশে নেই কোনো স্বজন, নেই বাবা-মায়ের সান্ত্বনার হাত। কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা এখনো তার পরিবারের সন্ধান পায়নি।
সিয়াম জানায় তার বাবার নাম জাহাঙ্গীর, মায়ের নাম শাপলা। তিনি দুটি ঠিকানা উল্লেখ করেছেন:
- ছিপতিপাড়া, বেলতলা, থানা বাঘমারা, জেলা রাজশাহী
- গ্রাম হিন্দুপাড়া, ইউনিয়ন মাধনগর, জেলা নাটোর
তবে এই তথ্য সত্ত্বেও এখনো তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
চিকিৎসকদের সতর্কতা
চিকিৎসকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন না হলে সিয়ামের স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলার সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক খন্দকার সাদিকুর রহমান বলেন, ‘এক পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। ওর পরিবার বা স্বজনদের কারো খোঁজ পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের সমাজসেবা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।’
সমাজের কাছে প্রশ্ন
হাসপাতালের বেডে শুয়ে সিয়ামের ছোট্ট প্রশ্ন: ‘আমি কি আবার হাঁটতে পারব?’ এই প্রশ্ন শুধু চিকিৎসকদের নয়, পুরো সমাজের প্রতিও। এখন মূল প্রশ্ন হলো – কে নেবে সিয়ামের দায়িত্ব? কে এগিয়ে আসবে তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে?
শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুঈদ হাসান তড়িৎ বলেন, ‘পথ শিশুদের সুরক্ষায় কোনো সরকারই দায়িত্ব নেয়নি। এনজিও বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো তেমন আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে না। হাসপাতালে সমাজ সেবা থাকলেও তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেই। পথ শিশুদের পুনর্বাসন দরকার, নিরাপদ বাসস্থান দরকার।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি হাসপাতালে গিয়ে সিয়ামের সার্বিক খোঁজখবর নেব। আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করব।’
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সিয়ামের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। মানবিক সহায়তার হাত বাড়ালে হয়তো আবারও দাঁড়িয়ে যেতে পারবে এই ছোট্ট শিশুটি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় – কতজন এগিয়ে আসবে তার পাশে? পথশিশুদের জন্য আমাদের সমাজ কতটা নিরাপদ?
এই ঘটনা শুধু একটি শিশুর ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সমগ্র সমাজ ব্যবস্থার প্রতি একটি কঠিন প্রশ্নচিহ্ন। পথশিশু সুরক্ষা, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
