বড়দের সুস্থতা ও চিন্তামুক্ত জীবনের জন্য খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম
বড়দের সুস্থ থাকতে খেলাধুলার ভূমিকা ও উপকারিতা

বড়দের সুস্থতা ও চিন্তামুক্ত জীবনের জন্য খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে কি? যখন সারাদিন দৌড়ঝাঁপ, লুকোচুরি আর কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে কোনো ক্লান্তি ছিল না! কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই খেলার সময় যেন কোথায় হারিয়ে যায়। আমরা সেই চঞ্চলতা ও কল্পনাশক্তির স্থানটি পূরণ করে ফেলি দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও গাম্ভীর্য দিয়ে। অনেকেই ধরে নেন, খেলাধুলা শুধু ছোটদের জন্য! কিন্তু বিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। শিশুদের মতোই বড়দের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

বড়দের খেলা কেমন হতে পারে

বড়দের খেলা মানে কিন্তু মাঠে গিয়ে ছোটদের মতো দৌড়াদৌড়ি করা বা খেলনা নিয়ে বসা নয়। এটি আসলে বয়সের সঙ্গে রূপ বদলায়। বড়দের খেলা হলো দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজগুলোর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এটি হতে পারে শারীরিক, সামাজিক, সৃজনশীল কিংবা পুরোটাই কল্পনার। হয়তো আপনি শখের বশে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন, বন্ধুদের সঙ্গে মজার কোনো জোকস বলে হাসাহাসি করছেন, কোনো পাজল মেলাচ্ছেন বা শুধু নিজের আনন্দের জন্য কোনো একটি কাজ করছেন। এগুলো সবই কিন্তু বড়দের খেলা। কোনো কাজের নির্দিষ্ট ফলাফলের আশা না করে, শুধু কৌতূহল ও আনন্দ নিয়ে তাতে ডুবে যাওয়ার এই মানসিকতাই হলো আসল খেলা।

খেলাধুলার উপকারিতা ও গবেষণালব্ধ ফলাফল

গবেষণা বলছে, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত আনন্দদায়ক বা খেলাধুলামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁরা জীবনের চাপ অনেক ভালোভাবে সামলাতে পারেন। নিউজিল্যান্ডের কয়েকটি পরিবারের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, রুটিনের বাইরের এসব খেলাধুলা বড়দের মানসিক চাপ তো কমায়ই, সেই সঙ্গে পরিবারের সবার মধ্যে সম্পর্কও দারুণ মজবুত করে।

বড়দের খেলার আরও কিছু জাদুকরী উপকারিতা রয়েছে। যেমন, কাজের চাপ থেকে মস্তিষ্ককে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো খেলা। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও এর দারুণ প্রভাব রয়েছে। আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে খেলাধুলা। এটি আমাদের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা কাজের ফাঁকে একটু আনন্দ বা খেলাধুলায় মাতেন, তাঁরা অন্যদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ও ইতিবাচক হন।

খেলাধুলার একটি দারুণ ক্ষমতা হলো, এটি যেকোনো বয়সের ব্যবধান মুছে দিতে পারে। বড়রা যখন ছোটদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠেন, তখন বয়স, পদবি বা সামাজিক মর্যাদার তফাতগুলো আর থাকে না। এটি দুই প্রজন্মের মধ্যে একটি সুন্দর সেতু তৈরি করে।

শহরগুলো কি বড়দের খেলার উপযোগী

সারা জীবনই যদি মানুষের খেলার প্রয়োজন থাকে, তবে আমাদের চারপাশের পরিবেশেরও তো সেভাবেই তৈরি হওয়া উচিত। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের চারপাশের পার্ক বা খেলার জায়গাগুলো শুধু শিশুদের কথা ভেবেই বানানো হয়। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বড়দের জন্য সবচেয়ে ভালো খেলার পরিবেশ হলো, যেটি দেখতে ঠিক প্রথাগত খেলার মাঠের মতো নয়; বরং সাধারণ হাঁটাচলার পথেই খেলার উপাদান ছড়িয়ে থাকে। যেমন, রাস্তার পাশে বড় বড় সিঁড়ি, হাঁটার পথে একটু ভিন্ন রকম পাথরের ধাপ, কিংবা শহরের কোনো এক কোণে রাখা মিউজিক্যাল সুইং! এগুলো বড়দেরও একটু থেমে আনমনে খেলা করতে উৎসাহ জোগাবে। এ ধরনের নকশা এখনো খুব একটা দেখা যায় না, তবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এটি দারুণ পদক্ষেপ হতে পারে।

লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই

আমাদের সমাজে বড়দের খেলাধুলাকে অনেক সময় লজ্জাজনক বা বেমানান হিসেবে দেখা হয়। এমন মানসিকতার কারণে অনেকেই নিজের ভেতরে থাকা সেই চঞ্চল শিশুটাকে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু যেদিন থেকে আমরা বুঝব, বড়দের খেলাধুলা কোনো অপরাধ বা লজ্জার বিষয় নয়, সেদিন থেকে আমাদের চারপাশের পরিবেশটা আরও অনেক বেশি সজীব ও আনন্দময় হয়ে উঠবে। তাই জীবনের এই যান্ত্রিক ব্যস্ততার মাঝে নিজের আনন্দের জন্য একটু সময় বের করুন। কারণ, সুস্থ থাকতে হলে শুধু ছোটদের নয়, আপনারও খেলার দরকার আছে!