গাছের পৃথিবী সংকুচিত: মানবসভ্যতার জন্য সতর্কবার্তা
মানুষ প্রায়ই মনে করে, পৃথিবীর ইতিহাসে সে-ই প্রধান চরিত্র। সভ্যতা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি—সকলকিছুর কেন্দ্র যেন মানুষ নিজেই। কিন্তু প্রকৃতির দৃষ্টিতে এই ধারণা সম্পূর্ণ সত্য নয়। কারণ, মানুষের বহু পূর্বে এই পৃথিবী ছিল বৃক্ষের, শৈবালের, ঘাসের, লতাগুল্মের। মানুষ এখনো যাহা কিছু ভোগ করে—অন্ন, বস্ত্র, ওষুধ, অক্সিজেন, আশ্রয়, এমনকি শিল্পোন্নয়নের বহু কাঁচামাল—সকল কিছুর ভিত্তিতেই কোনো না কোনোভাবে উদ্ভিদজগতের অবদান রয়েছে। সেই উদ্ভিদজগৎই যদি সংকুচিত হতে থাকে, তবে মানবসভ্যতার ভিত্তিও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।
সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা বিশ্ববাসীর জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা বহন করে এনেছে। গবেষণায় ৬৭ হাজারেরও অধিক উদ্ভিদ প্রজাতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ ৭ থেকে ১৬ শতাংশ উদ্ভিদ প্রজাতি তাদের বর্তমান আবাসস্থলের ৯০ শতাংশেরও অধিক হারাতে পারে। ফলে, বহু প্রজাতি বিলুপ্তির উচ্চঝুঁকিতে পড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জটিল প্রভাব
আমরা প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সমস্যা বলে বিবেচনা করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন একটি জটিল বাস্তবতা, যা বৃষ্টি, মাটির গুণাগুণ, আর্দ্রতা, ছায়া, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। একটি উদ্ভিদ কেবল মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না, তার অস্তিত্ব নির্ভর করে বহু সূক্ষ্ম পরিবেশগত শর্তের সমন্বয়ের উপর। সেই সমন্বয় ভেঙে গেলে উদ্ভিদের জন্য পৃথিবী ক্রমেই ছোট হয়ে আসে।
মানুষের মতো উদ্ভিদ স্থান পরিবর্তন করতে পারে না। তাদের বিস্তার ঘটে অত্যন্ত ধীরগতিতে—বাতাস, পানি, প্রাণী কিংবা অভিকর্ষ বলের সাহায্যে বীজ ও রেণুর মাধ্যমে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যেতে যেতে বহু সময় অতিবাহিত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে বহু উদ্ভিদ সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে নতুন কোনো অঞ্চলে পৌঁছানোর আগেই তারা অস্তিত্বসংকটে পতিত হচ্ছে।
ভয়ংকর প্রতিক্রিয়ামূলক চক্র
এই সংকটের আরেকটি ভয়াবহ দিক রয়েছে। উদ্ভিদ কেবল প্রকৃতির অলংকার নয়, স্থলভাগের অধিকাংশ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি। বনভূমি ও উদ্ভিদরাজি বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। মাটি রক্ষা করে, বন্যপ্রাণীর আবাস গড়ে তোলে, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ করে। সুতরাং উদ্ভিদের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য কমে গেলে প্রকৃতির স্বাভাবিক কার্বনচক্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে, বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ এক ভয়ংকর প্রতিক্রিয়ামূলক চক্রের সৃষ্টি হবে—জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভিদের ক্ষতি করবে, আবার উদ্ভিদের ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তনকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা
বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের দেশ এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও তাপপ্রবাহের প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। যদি উদ্ভিদ ও বনজ সম্পদের উপর এই চাপ আরো বৃদ্ধি পায়, তবে কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্যনিরাপত্তা—সকলই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। বিশেষত সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়বে।
অবশ্য গবেষণায় এও বলা হয়েছে যে পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে স্থানীয় উদ্ভিদ-বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। নতুন পরিবেশে কিছু প্রজাতি বিস্তার লাভ করবে। কিন্তু এই আংশিক লাভ সামগ্রিক ক্ষতিকে পূরণ করতে পারবে না। কারণ, নতুন উদ্ভিদসমাজের সৃষ্টি মানেই পুরাতন ভারসাম্যের অবসান। ইতিহাসে যারা কখনো একত্রে বাস করে নি, তারা একত্রে বাস করলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা এখনো অজানা।
উপসংহার
সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ বহুবার প্রকৃতিকে জয় করার কথা বলেছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, মানুষ প্রকৃতির অংশমাত্র। গাছপালা, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে মানুষ কখনো নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারে না। গাছের পৃথিবী সংকুচিত হওয়া মানে মানুষের নিরাপত্তার পরিধিও সংকুচিত হওয়া। অতএব, উদ্ভিদ-বৈচিত্র্য রক্ষা কেবল পরিবেশবাদীদের আবেগের বিষয় নয়, এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।



