নাক ডাকা একটি সাধারণ সমস্যা, যা ঘুমের সময় শ্বাসনালির সংকোচনের কারণে ঘটে। গবেষণা অনুযায়ী, ৪০ শতাংশ পুরুষ এবং ২৪ শতাংশ নারীর ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার প্রবণতা রয়েছে। যদিও এটি অনেকের জন্য বিরক্তিকর, তবে অতিরিক্ত নাক ডাকা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নাক ডাকার কারণ
ঘুমানোর পর শরীরের প্রায় সব মাংসপেশি শিথিল হয়ে যায়, যার মধ্যে গলার টিস্যু ও পেশিও অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে গলবিল বা শ্বাসনালিতে কিছুটা ব্লকের সৃষ্টি হয়। যখন নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া বাতাস প্রবেশ করে, তখন সেই বাতাস শিথিল টিস্যুতে কম্পন তৈরি করে, যা নাক ডাকার শব্দ সৃষ্টি করে।
শারীরবৃত্তীয় কারণ
নাকের অ্যানাটমির কারণে কারও কারও নাক ডাকার প্রবণতা বেশি থাকে। যেমন, সফট প্যালেট বা নাকের পেছনের নরম তালুর মাংস মোটা বা পুরু থাকলে, বা উভুলা (তালু থেকে ঝুলন্ত ছোট্ট অংশ) লম্বা থাকলে বাতাস ঢোকার সময় বেশি কম্পন হয়।
স্থূলতা
যাঁরা স্থূল বা মোটা, তাঁদের গলার পেছনে ও তালুতে চর্বি জমে শ্বাসনালি সরু হয়ে পড়ে। এর ফলে বাতাস ঢোকার সময় বাধা পায় ও বেশি কম্পন সৃষ্টি হয়। তাই ওজন বেশি এমন মানুষদের নাক ডাকার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
নাকের সমস্যা
সব সময় নাক বন্ধ থাকলে, নাকের মধ্যবর্তী সেপটাম বাঁকা থাকলে, বা জিব, টনসিল বা অ্যাডিনয়েড বড় থাকলে শ্বাসে বাধা বেশি হয় এবং নাক ডাকে বেশি।
ঘুমের পজিশন ও অভ্যাস
চিত হয়ে ঘুমানোর সময় শ্বাসনালি সবচেয়ে বেশি সরু হয়, তাই যাঁরা চিত হয়ে ঘুমান, তাঁদের নাক ডাকে। এছাড়া মদ্যপান ও ধূমপান নাক ও শ্বাসনালির টিস্যু ও পেশিকে শিথিল করে, যা নাক ডাকার কারণ হতে পারে।
স্লিপ অ্যাপনিয়া: একটি গুরুতর সমস্যা
অতিরিক্ত নাক ডাকা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এটি সাধারণত স্থূল ব্যক্তিদের বেশি হয়। এ কারণে রাতে ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালিতে বাধা থাকার কারণে শ্বাসে বারবার ব্যাঘাত ঘটে এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে দিনের বেলায় বারবার ঘুম পায়, মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে, মাথাব্যথা ও স্মরণশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এটি উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
নাক ডাকা বন্ধ করার উপায়
ওজন কমানো নাক ডাকা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বেশির ভাগ নাক ডাকার কারণ অতিরিক্ত ওজন। ওজন কমালে শ্বাসনালি ও গলার চর্বি কমে, ফলে বাতাস প্রবেশে বাধা কম পায়।
নাক বন্ধ বা অ্যালার্জি থাকলে তার চিকিৎসা নিতে হবে। নাকের ড্রপ, স্যালাইন স্প্রে বা অ্যান্টিহিস্টামিন নাক খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলতে হবে। নাসাল স্ট্রিপ বা মাউথ গার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘুমের পজিশন পরিবর্তন করেও উপকার মেলে। পাশ ফিরে ঘুমালে নাক ডাকা কমে। মাথার দিকটা বা বালিশ একটু উঁচু করেও সুফল মেলে। ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করতে হবে।
কিছু থ্রোট এক্সারসাইজও নাক ডাকা কমাতে সাহায্য করে। যেমন, মুখ বন্ধ করে ঠোঁট গোল করে ৩০ সেকেন্ড শ্বাস নেওয়া, জিব দিয়ে তালু স্পর্শ করার ব্যায়াম, ইংরেজি স্বরবর্ণ তিন মিনিট ধরে শব্দ করে উচ্চারণ করা দিনে কয়েকবার, মুখ খুলে চোয়াল এদিক-ওদিক করা ইত্যাদি।
স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীদের রাতে ঘুমানোর সময় সিপ্যাপ (কনটিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার) যন্ত্র ব্যবহার করতে বলা হয়। এতে একটি মাস্কের মাধ্যমে প্রেশারাইজড এয়ার নিশ্বাসের সঙ্গে দেওয়া হয়, যাতে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ ঠিক থাকে।
লেখক: অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ



