গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই চীন সফরে যাচ্ছেন। তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর বার্ষিক সভায় (২০২৬ সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন। চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী ‘স্বর্ণালি ৫০ বছর’-এর সূচনালগ্নে এই সফর অতীত অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
রাজনৈতিক আস্থা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব
চীন মনে করে, সব দেশই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমান সদস্য এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে অংশ নেওয়ার সমান অধিকার রাখে। চীন প্রতিবেশী কূটনীতিতে সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা, পারস্পরিক লাভ ও অন্তর্ভুক্তির নীতি অনুসরণ করে এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতিতে অটল। ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর চীন ও বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান প্রথমবার চীন সফর করেন। বেগম খালেদা জিয়া মোট নয়বার চীন সফর করেছেন, যার মধ্যে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই চীন সফরে যাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বের প্রমাণ। বর্তমানে চীন ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সূচনায় রয়েছে এবং বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই সফরে দুই দেশের নেতারা শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং অর্থনৈতিক রূপান্তর ও সংস্কার নিয়ে আলোচনা করবেন।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা
২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। চীন বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিযোগ্য শতভাগ পণ্যে শূন্য শুল্কসুবিধা দিয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস; প্রায় ৭০০টি চীনা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত রয়েছে, যা জ্বালানি, পরিবহন, বস্ত্র ও পোশাক, তথ্য ও যোগাযোগ খাতে কাজ করছে এবং লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কাঠামো উন্নত করার সুযোগ তৈরি করবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ, সবুজ উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন খাতে সহযোগিতা বাড়বে। চীনের সহায়তায় নির্মিত বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা এক গিগাওয়াটের বেশি, যা দেশের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ভূমিকা রাখছে।
জনকল্যাণ ও জনসম্পর্ক
চীন বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি যন্ত্রপাতি, ভেন্টিলেটর এবং মোবাইল সার্জিক্যাল যানের মতো চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়েছে। বন্যার সময় রাবারের নৌকা, লাইফ জ্যাকেট ও জেনারেটরের মতো জরুরি ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করেছে। এই সফরের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়বে এবং গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র, টেলিভিশনে বিনিময় জোরদার হবে।
আন্তর্জাতিক সমন্বয়
বাংলাদেশ সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব লাভ করেছে। চীন বাংলাদেশকে বৈশ্বিক দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এবং জাতিসংঘ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার এগিয়ে নিতে প্রস্তুত। এই সফরে দুই দেশের নেতারা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে মতবিনিময় করবেন।
ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত, বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য আরও বৃহৎ ও উজ্জ্বল রূপরেখা তৈরি করবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।



