কুবিতে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক ছুটিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা
কুবিতে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক ছুটিতে, পাওনা ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা

কুবিতে শিক্ষক সংকট: ৩২.৫১ শতাংশ শিক্ষক ছুটিতে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) মোট ২৮৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৯১ জন বিভিন্ন ধরনের ছুটিতে রয়েছেন, যা মোট শিক্ষকের ৩২ দশমিক ৫১ শতাংশ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষা ছুটিতে আছেন ৮৮ জন শিক্ষক। একই সময়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা প্রশিক্ষণে গিয়ে শর্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় শিক্ষকদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। পাওনা আদায়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নোটিশ দেওয়া শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিভাগভিত্তিক শিক্ষক ছুটির চিত্র

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কুবিতে মোট শিক্ষক রয়েছেন ২৮৬ জন। এর মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে ৯ জন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ৮ জন, গণিত, পরিসংখ্যান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগে ৭ জন করে, রসায়ন ও ফার্মেসি বিভাগে ৬ জন করে, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে ৫ জন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ইংরেজি ও বাংলা বিভাগে ৪ জন করে, অর্থনীতি, লোক প্রশাসন, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, আইসিটি ও আইন বিভাগে ৩ জন করে এবং প্রত্নতত্ত্ব, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা ও মার্কেটিং বিভাগে ২ জন করে শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন। এছাড়া দুইজন শিক্ষক ডেপুটেশনে এবং একজন বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকায় মোট ছুটিতে থাকা শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১ জন।

অর্থ পরিশোধ না করায় পাওনা ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা প্রশিক্ষণে গিয়ে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় শিক্ষকদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। যদিও অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যে অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং কারও কারও অর্থ পরিশোধের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। যেসব শিক্ষক এখনো অর্থ পরিশোধ করেননি, তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একাডেমিক কার্যক্রমে প্রভাব

এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষক ছুটিতে থাকায় একাডেমিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাহিম বলেন, “অনেক বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস ও কোর্স পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। এতে সেশনজটের শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।”

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩৪

জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯টি বিভাগে মোট শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার ৪৭৪ জন। সে হিসেবে বর্তমানে প্রতি ৩৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত ধরা হয় ১:২০।

ইউজিসির নীতি ও নতুন শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ‘টিচিং লোড ক্যালকুলেশন পলিসি অব পাবলিক ইউনিভার্সিটি-২০২২’ অনুযায়ী, কোনো বিভাগে অধিকসংখ্যক শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে বিদেশে অবস্থান করলে টিচিং লোডের ভিত্তিতে নির্ধারিত শিক্ষক সংখ্যার অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শিক্ষক নিয়োগের জন্য ইউজিসির কাছে আবেদন করা যায়।

শিক্ষকরা কেন বিদেশে থেকে যান

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে অনেক শিক্ষক দেশে ফিরে না আসার কারণ সম্পর্কে লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. নাজমুল হক বলেন, “যাদের মধ্যে প্রকৃত একাডেমিক আগ্রহ রয়েছে, তারা সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে যদি সেখানেই শিক্ষকতা বা গবেষণার ভালো সুযোগ পান, তাহলে অনেকেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। উন্নত একাডেমিক পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ, জীবনযাত্রার মান এবং সন্তানের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—এসব বিষয় তাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে গবেষণার জন্য বরাদ্দ খুবই সীমিত। বছরে এক লাখ টাকা গবেষণা অনুদান দিয়ে মানসম্মত গবেষণা করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও যন্ত্রপাতির ব্যয় অনেক বেশি। অন্যদিকে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাব এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহজেই পাওয়া যায়। ফলে অনেক শিক্ষক উন্নত গবেষণা পরিবেশের জন্য বিদেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।”

প্রশাসনের পদক্ষেপ

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সোলাইমান বলেন, “ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সংখ্যার বেশি শিক্ষককে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা প্রশিক্ষণের জন্য অনুমতি না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া যারা নির্ধারিত সময় শেষে দেশে ফেরেননি, তাদের বিষয়ে ইউজিসির অডিট আপত্তি ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে। বিষয়টি উপাচার্যকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম বলেন, “যেসব শিক্ষক বিদেশে গিয়ে শর্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করেননি, তাদের টাকা জমা দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হচ্ছে। আজও একজন শিক্ষককে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনেকেই ইতোমধ্যে অর্থ পরিশোধ করেছেন, আবার অনেকের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। যারা এখনও অর্থ জমা দেননি, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে যারা বিদেশে অবস্থান করছেন, তাদের ক্ষেত্রে করণীয় সীমিত। তবে নতুন করে যারা ছুটিতে যাবেন, তাদের ক্ষেত্রে ইউজিসির নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। কোনো বিভাগের মোট শিক্ষকের এক-তৃতীয়াংশের বেশি যেন একই সময়ে ছুটিতে না থাকেন, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, সরকারেরও আর্থিক ক্ষতির বিষয়। তাই ভবিষ্যতে ছুটি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও আরও সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।”