ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও বিতর্ক থামছে না। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর), সেমি-অটোমেটেড অফসাইড এবং ‘স্মার্ট বল’-এর মতো প্রযুক্তি রেফারির ভুল কমানোর লক্ষ্যে আনা হলেও তা ফুটবলের আবেগ ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা বলেছেন, প্রযুক্তির লক্ষ্য মানবিক ভুল কমানো। কিন্তু বাস্তবে প্রযুক্তির প্রয়োগে অসামঞ্জস্যতা, ধীরগতি এবং পক্ষপাতের অভিযোগ বাড়ছে।
প্রযুক্তি কি ফুটবলের আবেগ নষ্ট করছে?
প্রযুক্তির কারণে খেলার স্বাভাবিক গতি ও আনন্দ ব্যাহত হচ্ছে। গোল করার পর খেলোয়াড় ও দর্শকরা তাৎক্ষণিক উল্লাস করতে পারেন না, কারণ ভিএআর ও স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি পুরো আক্রমণভাগ খতিয়ে দেখে। দীর্ঘ পর্যালোচনার কারণে খেলার গতি নষ্ট হয় এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস ম্লান হয়। ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও এখন দীর্ঘ বিরতি দেখা যাচ্ছে।
অতি সূক্ষ্ম অফসাইড: প্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ
সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি সবচেয়ে বিতর্কিত। একজন খেলোয়াড়ের জুতোর অগ্রভাগ বা চুলের সামান্য ছোঁয়া প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে থাকলেই অফসাইড দেওয়া হচ্ছে, যা মাঠে কোনো প্রভাব ফেলে না। গ্রুপ পর্বে ইরানের শোজা খলিলজাদেহর গোল মাত্র এক মিলিমিটার অফসাইডে বাতিল হয়, যার ফলে ইরান বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সঠিক অ্যানিমেশন গ্রাফিকস না দেখানোও বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
ভিএআর-এর অসংগতি ও পক্ষপাতের অভিযোগ
একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ব্রাজিল-স্কটল্যান্ড ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোল ‘সফট কন্টাক্ট’-এর কারণে বাতিল করা হয়, অথচ ঘানা-ইংল্যান্ড ম্যাচে স্পষ্ট পেনাল্টি উপেক্ষা করা হয়। ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ কটাক্ষ করে বলেন, ‘ভিএআর হয়তো তখন কফি খেতে গিয়েছিল’।
আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ: বিতর্কের শীর্ষে
রাউন্ড অব ১৬-তে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে ভিএআর-এর সিদ্ধান্ত তুমুল সমালোচিত। মিশর ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর মোস্তফা জিকোর গোল বাতিল করা হয় মাঠের অন্য প্রান্তে মারওয়ান আতিয়ার হালকা ফাউলের কারণে, যা মাঠের রেফারি দেখেও ফাউল দেননি। মিশরের কোচ হোসাম হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে রেফারিংয়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার বক্সে সালাহর ফাউল ignored এবং ম্যাক অ্যালিস্টারের ফাউল উপেক্ষিত হয়।
বড় তারকাদের প্রতি বিশেষ সুবিধা?
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে লিওনেল মেসির বিপজ্জনক ফাউল কোনো কার্ড বা ভিএআর রিভিউ ছাড়াই উপেক্ষিত হয়। অভিযোগ উঠেছে, ফিফা ও রেফারি প্যানেল টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বার্থে বড় তারকাদের লাল কার্ড থেকে বাঁচিয়ে রাখছে।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: ট্রাম্পের অনুরোধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে অনুরোধ করায় ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রেফারিং ও টুর্নামেন্টের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রযুক্তির ব্যবহারে ধারাবাহিকতার অভাব
ভিএআর নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র ‘স্পষ্ট ও বড় ভুল’ হলেই হস্তক্ষেপ করা উচিত। কিন্তু মাঠের রেফারিরা ৫০-৫০ সিদ্ধান্তেও ভিএআর-এর ওপর নির্ভর করছেন। বেলজিয়াম-সেনেগাল ম্যাচে অতি মৃদু স্পর্শে পেনাল্টি দিতে ভিএআর ৭ মিনিট সময় নেয়, যা খেলার গতি ও আবেগ নষ্ট করে।
প্রযুক্তি নয়, প্রয়োগই সমস্যা
ফিফা বলছে, প্রযুক্তি রেফারির সহায়ক। কিন্তু সমর্থকদের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহারে ধারাবাহিকতা ও ন্যায্যতা আসেনি। কোন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা হবে, কীভাবে তা ব্যাখ্যা করা হবে এবং খেলার স্বাভাবিক আবেগ কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। আসল সমস্যা প্রযুক্তি নয়, এর প্রয়োগে।



