চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী অনুপস্থিত: পাঁচটি কারণ বিশ্লেষণ
চট্টগ্রাম বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী অনুপস্থিত

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি: একটি গভীর বিশ্লেষণ

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন চলতি এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে না, যা শিক্ষা খাতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং ২০২৩ সালে অষ্টম শ্রেণিতে নিবন্ধন করা শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে। বোর্ডের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মতে, পাঁচটি প্রধান কারণ এই ঝরে পড়ার পেছনে দায়ী।

পরিসংখ্যান ও ঝরে পড়ার হার

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন পাঁচ জেলায় এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮ শিক্ষার্থী। তবে ২০২৩ সালে অষ্টম শ্রেণিতে নিবন্ধন করা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ হাজার ১৮৩ জন পরীক্ষায় অনুপস্থিত। নবম শ্রেণিতে ওঠার সময় ২২ হাজার ৯৭১ জন এবং দশম শ্রেণিতে উঠে আরও ৩ হাজার ২১২ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, প্রায় ৪ হাজার। অন্যদিকে, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষায় ১ হাজার ৩৭৩ জন অনিয়মিত পরীক্ষার্থী বেড়েছে। তবে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঝরে পড়ার পাঁচটি মূল কারণ

শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. বাল্যবিবাহ: অনেক পরিবার আর্থিক ও সামাজিক চাপে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।
  2. শিশুশ্রম: দরিদ্র পরিবারের ছেলেরা অষ্টম বা নবম শ্রেণির পরই জীবিকার সন্ধানে কাজে নেমে পড়ছে।
  3. কারিগরি শিক্ষায় স্থানান্তর: অনেক শিক্ষার্থী মূলধারার শিক্ষা ছেড়ে কারিগরি ধারায় চলে যাচ্ছে।
  4. বিদেশমুখিতা: কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, যা শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
  5. টেস্ট পরীক্ষায় কড়াকড়ি: এবার টেস্ট পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

চট্টগ্রামের ১০টি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, অটোপাস, শিক্ষাক্রম পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। ২০২৪ সালে নতুন শিক্ষাক্রম এবং ২০২৫ সালে পুরোনো শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় পায়নি।

প্রত্যন্ত এলাকায় সমস্যা তীব্র

শিক্ষকদের মতে, প্রত্যন্ত এলাকায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা শহরের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয় যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন। চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, "প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে পাহাড়ের তিন জেলায় সমস্যা বেশি। এসব জেলায় পর্যাপ্ত লোকবলের অভাব রয়েছে।"

সমাধানের পথ ও গবেষণার অভাব

চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, "কী কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে গেছে, সেটি নিয়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণা নেই। তবে বোর্ডের গবেষণার সক্ষমতা আছে এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এটি করা সম্ভব।"

শিক্ষাবিদরা ঝরে পড়া রোধে দরিদ্র পরিবারে আর্থিক সহায়তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি, এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি, কারিগরি শিক্ষায় চলে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমন্বিত ডাটাব্যবস্থা গড়ে তোলারও সুপারিশ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহম্মদ আমির উদ্দিন বলেন, "বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের পাশাপাশি অটোপাসে ওপরের শ্রেণিতে ওঠায় পরীক্ষাভীতি তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত তথ্য থাকলে গবেষণা সম্ভব, কিন্তু শিক্ষা খাতে আগ্রহ কম দেখা যায়।"

এসএসসি পরীক্ষা ২১ এপ্রিল শুরু হবে বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে।