প্রথম আলো ট্রাস্টের অদম্য মেধাবী অনুষ্ঠানে আজ অতিথি সামাউল ইসলাম। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার শৈশব ও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের গল্প শুনিয়েছেন তিনি।
শৈশব ও স্বপ্নের শুরু
সামাউল ইসলাম জানান, তার ছোটবেলা সাধারণ বাচ্চাদের মতোই কেটেছে। পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলায় বেশি মেতে থাকতেন। ক্লাস ফাইভ ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলেও তখন জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। নবম শ্রেণিতে করোনা মহামারি শুরু হলে প্রায় দেড় বছর স্কুল বন্ধ ছিল। সেই সময় তিনি বাবার সঙ্গে সবজির ব্যবসা করে পরিবারকে সাহায্য করেছেন।
ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন আসে একটি দুঃখজনক ঘটনা থেকে। করোনাকালে তার দাদি ব্রেন স্ট্রোকে মারা যান এবং পরিবার বুঝতেই পারেনি যে স্ট্রোক হয়েছে। সেই কষ্ট থেকে তিনি ডাক্তারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া তিনি ভেবেছিলেন, ইঞ্জিনিয়ার হলে নিজের জন্য কিছু করতে পারবেন, কিন্তু ডাক্তার হলে মানুষ তার বাবা-মায়ের কাছে আসবে এবং সমাজে তাদের সম্মান বাড়বে।
কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস
দেড় বছর পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর ক্লাসে ফিরে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েন সামাউল। তখন তিনি নিজের ওপর কঠোর পরিশ্রম চাপিয়ে দেন। তিনি বলেন, "এমন দিন গেছে যে আমি সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাই টানা পড়তাম। রাতেও অল্প ঘুমিয়ে আবার পড়া শুরু করতাম।" এই ধারাবাহিকতা তিনি মেডিকেল অ্যাডমিশন পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত বজায় রেখেছিলেন। পরিশ্রমের ফলেই এসএসসিতে তিনি স্কুলে প্রথম হন।
সামাউলের আত্মবিশ্বাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "অনেকে আমাকে 'ওভার কনফিডেন্ট' বলে, কিন্তু আমার কাছে এটা পরিশ্রমের ফল। আমি এসএসসিতে কত পাব বা মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় কত পাব, তার একটা ছক মনে মনে এঁকে নিতাম। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমি আশা করেছিলাম ৮৫ পাব, পেয়েছিলাম ৮৪.৫।" তার মূলমন্ত্র: 'পারব মানে পারবই, একজন যদি পারে তবে সেটা আমি কেন পারব না?'
কার্ডিওলজিস্ট হওয়ার স্বপ্ন
সামাউল ইসলাম কার্ডিওলজিস্ট হতে চান। তিনি বলেন, "হৃদরোগ বা কার্ডিওলজি আমাকে শুরু থেকেই টানে। তবে মেডিকেল ক্যারিয়ারে সময়ের সাথে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। কোন দিকে গেলে মানুষের সেবা বেশি করা যাবে এবং ভবিষ্যৎ সচ্ছল হবে, সেসব মিলিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।"
অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ
যেসব শিক্ষার্থী কঠোর পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না এবং হতাশ হয়, তাদের উদ্দেশ্যে সামাউল বলেন, "কখনো নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আনা যাবে না। অনেকে একসঙ্গে দুই-তিনটা লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চায়, যেমন ভার্সিটি আর মেডিকেল একসঙ্গে রাখা। এতে ফোকাস নষ্ট হয়। শুরু থেকেই গোল বা লক্ষ্য নির্দিষ্ট করতে হবে। আর পড়াশোনার গ্রাফটা হতে হবে একদম সমান্তরাল। একদিন ১৫ ঘণ্টা আর পরের দিন ২ ঘণ্টা পড়লে হবে না; প্রতিদিন নিয়ম করে ১০ ঘণ্টাই পড়তে হবে। নিজের পরিশ্রম আর আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখলে সফলতা আসবেই।"
প্রথম আলো ট্রাস্টের শিক্ষাবৃত্তি
সামাউল প্রথম আলো ট্রাস্টের মাধ্যমে 'প্লানেটারি হেলথ একাডেমি ট্রাস্ট' (পিএইচএ) থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছেন। তিনি পিএইচএ-র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "বিশেষ করে ডা. তাসবিরুল ইসলাম স্যারের মতো বড় মাপের মানুষদের সঙ্গে এই বয়সে কথা বলা বা তাঁদের গাইডেন্স পাওয়া আমার জন্য কল্পনাতীত ছিল। তাঁরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারছি কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের ক্যারিয়ার গড়া যায় এবং দেশের সেবায় কাজ করা যায়। এটি আমার মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ।"
অনুষ্ঠান শেষে সামাউল সবার কাছে দোয়া চান যেন তিনি একজন মানবিক চিকিৎসক হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করতে পারেন।



