যীশু সেনগুপ্ত। ইনস্টাগ্রাম থেকেবাংলা, হিন্দি কিংবা দক্ষিণি—সব ভাষার চলচ্চিত্রেই এখন নিয়মিত দেখা যায় তাঁকে। ফলে অনেকেই তাঁকে ‘প্যান ইন্ডিয়া তারকা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে এই তকমাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে নারাজ এই অভিনেতা। হালকা হাসি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ট্যাগে আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না। আমি শুধু একজন অভিনেতা, অভিনয় করাটাই আমার কাজ। তবে এসব শুনতে খারাপও লাগে না।’ ভাষা নিয়েও তাঁর কোনো সংকোচ নেই। ভালো গল্প আর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র—এই দুটি বিষয়ই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যীশুর ভাষায়, ‘হিন্দি, তেলেগু বা বাংলা—যে প্রজেক্ট ভালো লাগে, সেটাই করি। এ বছরই দুটি বাংলা ছবিতে কাজ করেছি, আরও করার ইচ্ছা আছে।’
বাংলাদেশের সিনেমায় কাজের অভিজ্ঞতা
গত বছর বাংলাদেশের সিনেমা ‘বরবাদ’–এ অভিনয় করেছিলেন যীশু। প্রায় ২৫ বছর পর বাংলাদেশের কোনো সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছবিটিতে শাকিব খান ছিলেন। বাঙালি ইউনিট নিয়ে মুম্বাইয়ে শুটিং করেছি। সব মিলিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা।’ ‘ভূত বাংলা’ ছবির সঙ্গে তাঁর যাত্রাটাও বিশেষ। মুম্বাইয়ে অন্য একটি ছবির শুটিংয়ের সময় পরিচালক প্রিয়দর্শন তাঁকে গল্পটা শোনান। পরে জানতে পারেন, চরিত্রটি তাঁর কথা মাথায় রেখেই লেখা। প্রিয়দর্শনের কাজের ধরন নিয়েও মুগ্ধ এই অভিনেতা, ‘উনি অভিনেতাদের অনেক স্বাধীনতা দেন। আমাদের ভাবনাকে গুরুত্ব দেন। এই স্বাধীন পরিবেশে কাজ করতে পারাটা বড় বিষয়।’
প্রিয়দর্শনের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক
প্রিয়দর্শনের সঙ্গে যীশুর পরিচয়ও অনেক দিনের। সিসিএলে (সেলিব্রিটি ক্রিকেট লিগ) প্রায় ১৬ বছর আগে প্রথম দেখা হয়েছিল। সেই স্মৃতি মনে করে যীশু বলেন, ‘আমি তখন বাংলার অধিনায়ক, উনি কেরালা দলের মালিক। ১ রানে ম্যাচ হেরে আমি খুব কাঁদছিলাম। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করেছিলেন। পরে সেই সম্পর্কই কাজের সুযোগে রূপ নেয়।’
অক্ষয় কুমারের সঙ্গে কাজের স্মৃতি
ছবিতে অক্ষয় কুমারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে স্মরণীয়। ‘৩৬ দিন একসঙ্গে শুটিং করেছি। অক্ষয় কখনো বুঝতে দেন না উনি এত বড় তারকা। প্রথম দিনেই আপন করে নিয়েছিলেন,’ বলেন যীশু। শুটিং সেটের নানা দুষ্টুমির কথাও উঠে আসে তাঁর কথায়, ‘উনি প্র্যাঙ্কের মাস্টার। আমি বরং ওনাকে প্র্যাঙ্ক করতে সাহায্য করতাম। প্রিয়ন স্যারও এতে যোগ দিতেন।’
একই ছবিতে পরেশ রাওয়াল, রাজপাল যাদবদের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করাটাও যীশুর কাছে ছিল শেখার অভিজ্ঞতা। আর বহু বছর পর টাবুর সঙ্গে আবার পর্দা ভাগাভাগি করে ভালো লেগেছে বলেও জানান তিনি।
হরর-কমেডি ও বাংলা সিনেমা
হরর-কমেডি ঘরানার ছবিতে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে যীশু বলেন, ‘এ ধরনের চরিত্র খুব একটা পাই না। তাই কাজটা খুব উপভোগ করেছি। আমার চরিত্রটা পুরোপুরি কমেডি নয়—৬০ শতাংশ সিরিয়াস, ৪০ শতাংশ কমেডি।’ বাংলা সিনেমার মান নিয়ে যে বিতর্ক প্রায়ই শোনা যায়, সেটি নিয়েও যীশুর অবস্থান স্পষ্ট, ‘আমি মনে করি না বাংলা ছবির মান কমে গেছে। আমরা নিয়মিত জাতীয় পুরস্কার পাই। আর জাতীয় পুরস্কার তো টাকা দিয়ে কেনা যায় না।’
নারীকেন্দ্রিক ছবি ও চরিত্র বাছাই
বলিউডে নারীকেন্দ্রিক ছবিতে কাজ করা নিয়েও যীশুকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এসব নিয়ে খুব একটা ভাবেন না তিনি। তাঁর মতে, চরিত্রের গুরুত্বটাই আসল। তিনি বলেন, ‘“মারদানি”, “মণিকর্ণিকা”, “ট্রায়াল”, “শকুন্তলা দেবী”—এসব প্রজেক্টে কাজ করে অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। আমি কোনো প্রকল্প নারী বা পুরুষকেন্দ্রিক হিসেবে দেখি না, দেখি চরিত্রটা গল্পের জন্য কতটা জরুরি।’ চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও যীশুর অবস্থান স্পষ্ট। ‘আমার চরিত্র বাদ দিলে যদি গল্প এগোয়, সেই কাজ করি না। আর না এগোলে ছোট ভূমিকাতেও করি। নায়ক–খলনায়ক ভেবে নয়, ভালো লাগার জায়গা থেকে কাজ বেছে নিই।’
কলকাতার প্রতি টান ও বলিউডের কাজ
মুম্বাইয়ে কাজের ব্যস্ততা থাকলেও কলকাতার প্রতি যীশুর টান অটুট, ‘সুযোগ পেলেই কলকাতায় যাই। বন্ধুদের খুব মিস করি। ওরা আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’ বলিউডে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে যীশু বলেন, ‘অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করা আমার কাছে বড় সৌভাগ্যের। কাজল, বিদ্যা বালান, রানী মুখার্জি, সুস্মিতা সেন, টাবু, বিপাশা বসু—প্রতিটি প্রজেক্টই ছিল শেখার জায়গা।’ নিজের অভিনয়যাত্রা নিয়েও বিনয়ী এই অভিনেতা। আনমনা হয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, অভিনয়ের এখনো মাত্র ২–৩ শতাংশ শিখেছি।’
নতুন প্রযোজনা সংস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সম্প্রতি অভিনেতা সৌরভ দাসকে নিয়ে ‘হোয়াই সো সিরিয়াস ফিল্মস’ নামে নতুন প্রযোজনা সংস্থা শুরু করেছেন যীশু। এই প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়েও বেশ আশাবাদী তিনি। ‘শুধু বাংলা নয়, সব ভাষায় ছবি প্রযোজনা করতে চাই। সিনেমার পাশাপাশি সিরিজ, ইভেন্ট—সব ধরনের কাজই করব,’ বলেন অভিনেতা। টলিউডের অনেক অভিনেতা এখন নিয়মিত মুম্বাইয়ে কাজ করছেন। তবে এটিকে বাংলায় কাজের সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ যীশু। তাঁর মতে, ‘অভিনেতাদের কোনো জাতপাত বা ধর্ম হয় না। আমরা বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে কাজ করছি, এটাই বড় প্রাপ্তি। ওটিটির কারণে এখন কাজের ব্যাপ্তিও বেড়েছে।’
পরিবার ও শেষ কথা
আড্ডার শেষে পরিবারের প্রসঙ্গে কথা হয়, মেয়েদের নিয়ে যীশু বলেন, ‘ওরা আমার সিনেমা খুব একটা দেখে না। শুধু জানে, বাবা অভিনয় করেন।’ বড় মেয়ে সারা অভিনয়ে আসতে চায় না বলেও জানান তিনি।



