শিক্ষক নির্যাতন: ক্রমবর্ধমান সংকটের কারণ ও প্রতিকার
শিক্ষক নির্যাতন: কারণ ও প্রতিকার বিশ্লেষণ

শিক্ষক নির্যাতন: একটি জাতীয় সংকটের উত্থান

দেশে শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী পাঠবিমুখ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। স্বেচ্ছায় বা উসকানিতে কিছু শিক্ষার্থী সরাসরি শিক্ষক নির্যাতনে অংশ নিচ্ছে বা সমর্থন দিচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নির্যাতনের বিভিন্ন রূপ ও প্রেক্ষাপট

শিক্ষকদের অপমান-অপদস্থ করে জোর করে পদত্যাগ করানো, কান ধরে উঠবস করানো, জনসম্মুখে দিগম্বর করা, গলায় জুতার মালা ঝুলিয়ে দেওয়া, গাছে বেঁধে রাখা, পিটিয়ে আহত বা নিহত করার মতো ঘটনা অতীতেও দেখা গেছে এবং বর্তমানেও সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন, ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এমনকি হেনস্তা করে প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে।

বেসরকারি শিক্ষকদের উপর নির্যাতনের প্রবণতা

বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক নির্যাতনের ধরনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা জনপ্রতিনিধি, কমিটির সদস্য, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের দ্বারা তুলনামূলকভাবে বেশি নির্যাতিত হচ্ছেন। অথচ এই চারটি গ্রুপই হওয়ার কথা ছিল বেসরকারি শিক্ষকদের সার্বক্ষণিক রক্ষাকবচ। শিক্ষক নির্যাতিত হলে সহানুভূতি নিয়ে সদলবলে এগিয়ে আসার কথা জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকদের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের তো শিক্ষক নির্যাতন রোধ নৈতিক দায়িত্ব হওয়ার কথা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শ্রদ্ধার সংকট ও সামাজিক পরিবর্তন

অদূর অতীতে সমাজে একটি ধারণা বিরাজমান ছিল যে শিক্ষকদের ওপর আঘাত এলে শিক্ষার্থীরা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে রুখে দাঁড়াবে। কিন্তু বর্তমান চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেকেই এখন শিক্ষকদের সমীহ করে না, এবং শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা বা গায়ে হাত তোলার কথা চিন্তাও করে না। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা ও শক্ত প্রতিবাদহীনতা, যা শিক্ষক নির্যাতন বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।

শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও প্রভাব

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো শিক্ষক নির্যাতন ও হত্যায় যুক্ত হয়ে পড়েছে খোদ শিক্ষার্থীরাও। বিভিন্ন বাস্তব কারণে শিক্ষার্থীরা আর আগের মতো শ্রদ্ধা করে না শিক্ষকদের। তারা জানে, এই সমাজের শিক্ষকদের বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের রাষ্ট্র সচ্ছলতা দেয় না। তারা দেখে, সরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, কমিটির সদস্য, নেতাকর্মী, বিত্তবান, বাড়িওয়ালা, দোকানি, অভিভাবক কেউই যথাযথ সম্মান করে না শিক্ষকদের। তাহলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সম্মান করা শিখবে কোথা থেকে?

কমিটির প্রভাব ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা

আগের দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলতে সমাজের সবাই জানতো ও মানতো হেড স্যার বা প্রিন্সিপাল স্যারকেই; আর এখন প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলতে অনেকেই বুঝেন কমিটির চেয়ারম্যানকে। শিক্ষক সম্প্রদায় এখন বেশির ভাগ স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দ্বারা গঠিত কমিটির অধীনস্থ স্বল্প বেতনভোগী হতদরিদ্র কর্মচারী মাত্র। কমিটির হাতেই তাদের বেতন, পদোন্নতি ও চাকরি। তাই তারা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভেদের প্রভাব

অনেক সময় ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে নির্যাতিত বা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন আমাদের কোনও কোনও শিক্ষক। মাঝে মাঝে খুব ভয়াবহ রূপ লাভ করে এটি। শিক্ষার ক্ষেত্রে ধর্ম বা রাজনীতি মুখ্য হয়ে উঠলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। খোঁজা হয় পরস্পরের দোষ। তৈরি হয় বৈষম্য, বেড়ে যায় নির্যাতন। ইদানীং এসব ক্ষেত্রেও অনেক সময় টেনে আনা হয় ধর্মীয় ও দলীয় বিভেদ, যা শিক্ষাক্ষেত্রে আরও সংকট তৈরি করছে।

শিক্ষকদের ভূমিকা ও ঐক্যের অভাব

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে শিক্ষক নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষকদের ভূমিকা অন্যান্য পেশাজীবীর মতো জোরালো নয়। বাস্তবে বিভিন্ন দলে ও উপদলে বিভক্ত আমাদের শিক্ষকরা। সরকারি, বেসরকারি, প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, স্কুল ও কলেজ, ডিগ্রি কলেজ, অনার্স কলেজ, মাস্টার্স কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, মাদ্রাসা, ক্যাডেট মাদ্রাসা, কেজি স্কুল, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, আরবি মিডিয়াম মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, খারিজি মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা, ইফতেদায়ি মাদ্রাসা, দাখিল মাদ্রাসা, ফাজিল মাদ্রাসা, কামিল মাদ্রাসা ইত্যাদি ভিত্তিক বিভক্ত বিভিন্ন গ্রুপ।

প্রতিকারের জন্য জরুরি পদক্ষেপ

এখনই বন্ধ করতে হবে শিক্ষক নির্যাতন। কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যাবে না শিক্ষকের অপমান। বারবার সৃষ্টি করতে হবে, প্রচার করতে হবে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার উদাহরণ। ব্যাপকভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে শিক্ষার্থীদের সুপথে আনার কার্যকর পরিকল্পনা। অত্যন্ত যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যোগ্যতা এবং ভূমিকা। শিক্ষকদের হতে হবে ঐক্যবদ্ধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে করতে হবে প্রতিবাদ, গড়ে তুলতে হবে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ। এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সচেতন নাগরিকদের। অবশ্যই সরকারিভাবে নিশ্চিত করতে হবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। প্রয়োজনে প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে শিক্ষক সুরক্ষা আইন।

অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে এই জাতিকে দিতে হবে চরম মূল্য। কেননা, বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও মাথানত শিক্ষক দিয়ে কখনোই তৈরি হবে না মাথা উঁচু করে বিশ্বদরবারে দাঁড়াবার মতো সুযোগ্য মানুষ।