শিক্ষামন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ: অতিরিক্ত পাঠ্যবই চাহিদার অভিযোগে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় এক কোটি অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদা দেওয়ার অভিযোগে জেলা-থানা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩৪টি টিমের তদন্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত হয়েছে, যা শনিবার (১৮ এপ্রিল) মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে কালোবাজারির প্রমাণ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কালোবাজারিতে পাঠ্যবই বিক্রির সাথে জড়িত। তারা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত বই গ্রহণ করে আসছেন, এরপর বাড়তি বইগুলো অধিক মূল্যে বিক্রি করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একশ্রেণীর প্রধান শিক্ষকও এই সিন্ডিকেটে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বই ছাপানোর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নত মানসম্পন্ন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে কাজ শুরু করেছে এনসিটিবি। তবে মাধ্যমিকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য মাত্রাতিরিক্ত বই ছাপানোর কথা একটি সংস্থার মাঠ পর্যায় থেকে জানানোর পর নড়েচড়ে বসে সংস্থাটি। বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীর নজরে এলে সব উপজেলা থেকে ফের পাঠ্যবইয়ের চাহিদা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
৩৪টি টিমের তদন্ত ও ফলাফল
জেলা-থানা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে পাঠানো বইয়ের সঠিক সংখ্যা যাচাইয়ে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩৪টি টিম কাজ শুরু করে। সব উপজেলায় বুধবার ও বৃহস্পতিবার মাঠ পর্যায়ের কাজ শেষ করে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন কর্মকর্তারা। মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক তদন্তে এক কোটি অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদা পাঠানোর প্রমাণ মিলেছে। গতকাল তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়ে জড়িত শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
সংখ্যাগত গড়মিল ও শাস্তির আওতা
মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, এবার দুই শতাধিক শিক্ষা অফিসার শাস্তির আওতায় আসছেন বলে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সারা দেশ থেকে পাঠ্যবইয়ের চাহিদা পাঠানো তথ্যে গত বছরের তুলনায় এবারের সংখ্যায় বড় ধরনের গড়মিল পেয়েছে সরকারের একটি সংস্থা। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ছিল ২১ কোটি ৩৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৯টি, অন্যদিকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ছিল ২২ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৩১৮টি। গত বছরের তুলনায় এবার ৯৪ লাখ ৬২ হাজার ৮২৯টি বই বেশি ছাপার চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও সংশ্লিষ্ট পদবিন্যাস
সরকার কর্তৃক বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক ছাপানোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অসাধু প্রেস মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা শিক্ষা অফিসাররা এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চাহিদার তুলনায় পাঠ্যপুস্তকের অতিরিক্ত প্রদান করা হয়, পরে এসব বই না ছাপিয়ে কিছু প্রেস মালিক টাকা তুলে নেয় অথবা বই ছাপিয়ে সরবরাহ করার পর বইগুলো বাজারে কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রশ্রয়ে বছরের পর বছর এ অনিয়ম হয়ে থাকে বলে জানা গেছে।
এ বছর মাঠ পর্যায়ে থেকে প্রাপ্ত চাহিদায় দেখা যায়, কিছু কিছু উপজেলায় বিস্ময়করভাবে বেশি চাহিদা দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি উপজেলায় ২০২৬ সালের চাহিদার তুলনায় ২০২৭ সালে প্রায় ১৭৯ শতাংশ বেশি চাহিদা দেওয়া হয়, আরেক উপজেলায় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি চাহিদা দেওয়া হয়েছে। সব স্তরের পাঠ্যবই ছাপার কাজ দেখভাল করেন এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক)। গত ১৩ এপ্রিল এই পদ থেকে অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) পদে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবু নাসের টুকু। তিনি শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, প্রায় এক কোটি অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদা এবার এসেছে, যা এনসিটিবি ও মন্ত্রণালয়ের ৩৪ টিমের তদন্ত প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।



