প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস পরিকল্পনা: শিক্ষকদের অফলাইন পাঠদানের জোরালো পরামর্শ
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সারা দেশের মহানগর এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন ও সশরীরে ক্লাস চালুর বিষয়ে আলোচনা করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বুধবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাসে অনাগ্রহ ও অফলাইনের পক্ষে যুক্তি
মন্ত্রীর অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনার বিপরীতে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস করতে আগ্রহী নন বলে জানা গেছে। তারা দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেন যে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে অনলাইনের চেয়ে অফলাইন শিক্ষাব্যবস্থা বেশি উপযোগী। শিক্ষকরা উল্লেখ করেন, অনলাইন ব্যবহারের কুফল বর্তমানে বেশি দৃশ্যমান, কারণ এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায় এবং ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি বাড়ে।
এছাড়া, অনলাইনে কার্যকরভাবে পড়ানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। শিক্ষকরা প্রাথমিকে অনলাইন ক্লাস নেওয়া কষ্টসাধ্য বলে মন্ত্রীকে অবহিত করেন। তারা আরও জানান, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা ডিভাইস ব্যবহার করতে জানে না এবং অনেক পরিবারের পক্ষে শিশু শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে যুক্ত করা সম্ভব হবে না। এ সময় শিক্ষকদের অনেকে মন্ত্রীর কাছে অনলাইন ক্লাসের ডিভাইসের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
মন্ত্রীর পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য বাস্তবায়ন
আলোচনা সভা সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রী প্রাথমিকভাবে ছয় দিন ক্লাস রেখে এর মধ্যে জোড়-বিজোড় মিলিয়ে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীর পাঠদানের পরিকল্পনার কথা জানান। উদাহরণস্বরূপ, শনিবার যদি অনলাইন ক্লাস হয়, তাহলে রোববার অফলাইন ক্লাস হবে। এই পদ্ধতিতে একদিন অনলাইন ক্লাসের পর পরদিন সশরীর ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। মন্ত্রীর এই পরিকল্পনা শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে, যারা অনলাইন ক্লাসের নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন।
অফলাইন শিক্ষার সুবিধা ও অতিরিক্ত প্রস্তাবনা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের বাসা থেকে যাতায়াতের দূরত্ব খুব বেশি নয়, এবং বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়। তাই অনলাইনে পাঠদান ব্যবস্থা রাখলে খুব বেশি সুফল আসবে না। বরং অফলাইনে পাঠদান চালু রাখলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বেশি সাশ্রয় হবে বলে তিনি মত দেন।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা একমত পোষণ করেন যে, অফলাইন ক্লাস চালু থাকলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনার মধ্যে থাকে। তাই তারা অনলাইন ক্লাস চালু না করার পরামর্শ দেন এবং সরাসরি অফলাইন ক্লাস চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
এছাড়া, বিদ্যুৎ অপচয় রোধে বাসা-বাড়িতে ডিভাইস, ফ্যান ও এসির ব্যবহার কমাতে হবে বলে পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে এসি ব্যবহারে সংযম আনার জন্য অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতেও অপচয় কমানো সম্ভব হয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অতিরিক্ত উদ্যোগ
আলোচনায় আরও উঠে আসে যে, যাতায়াতের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল বাস চালুর ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাবে এবং জ্বালানি সাশ্রয় করবে। এছাড়া, সকালে স্কুল চালু (মর্নিং স্কুল) করা যেতে পারে, যাতে দিনে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।
প্রয়োজনে স্কুলের ছুটি বাড়ানো এবং ছুটির দিনেও সীমিত আকারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মতামত প্রকাশ করা হয়। এই সমস্ত প্রস্তাবনা জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা খাতের ভূমিকা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটায়।
সর্বোপরি, এই আলোচনা সভা প্রাথমিক শিক্ষায় অনলাইন ও অফলাইন পদ্ধতির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে, যেখানে শিক্ষকদের মতামত অফলাইন শিক্ষার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করছে।



