নোয়াখালীতে মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি অভিযোগ, মানববন্ধনের নামে হামলা
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় একটি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে হেফজ পড়ুয়া এক ১৪ বছর বয়সী ছাত্রীকে যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেয়ার পর ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে 'তৌহিদি জনতার' ব্যানারে মানববন্ধন করিয়ে বাড়িতে হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও আকারে ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগের বিবরণ ও ঘটনার ক্রম
স্থানীয় দারুল আকরাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঘটে। সেদিন সকালে ভুক্তভোগী ছাত্রীর দাদি তাকে দেখতে মাদ্রাসায় গেলে, শিক্ষক তাকে জানান যে তার নাতনির কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে ঝাড়ফুঁক দিতে হবে। এ কথা বলে দাদিকে সরিষার তেল আনার জন্য বাইরে পাঠিয়ে তিনি ছাত্রীকে নিজের শয়নকক্ষে নিয়ে যান এবং সেখানে যৌন হয়রানি করেন। দাদি ফিরে এসে নাতনির কান্নার শব্দ শুনে কক্ষে প্রবেশ করলে শিক্ষক ছাত্রীকে ছেড়ে দেন।
বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি সালিশের মাধ্যমে সমঝোতার জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারকে চাপ দিতে শুরু করেন। প্রায় আড়াই মাস ধরে সময়ক্ষেপণ চলার পর, কোনও সমাধান না হওয়ায় গত ১৬ এপ্রিল ভুক্তভোগীর বাবা চরজব্বর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগের পরের হামলা ও পুলিশের তদন্ত
অভিযোগ দেয়ার পরই শিক্ষক আবুল খায়ের ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নে 'তৌহিদি জনতার' ব্যানারে একটি মানববন্ধনের আয়োজন করান। এই মানববন্ধনের নামে মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনা ঘটায়। ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার (১৮ এপ্রিল) এটি ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়।
হামলা ও মারধরের পর পুলিশ অভিযোগটি একটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে। বর্তমানে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমার মেয়েকে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের ঝাড়ফুঁকের কথা বলে যৌন হয়রানি করেন। বিচার চাওয়ায় তিনি সময়ক্ষেপণ করাতে থাকেন। শেষে থানায় অভিযোগ দেয়ায় কিছু লোকজন দিয়ে মানববন্ধন করিয়ে আমার বাড়িতে হামলা ও মেয়েকে মারধর করিয়েছেন। আমরা এখন আতঙ্কে আছি।'
পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের অবস্থা
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চরজব্বর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বাপন চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, 'অভিযোগ পেয়ে সেদিনই আমরা ঘটনার তদন্তে গিয়েছিলাম। অভিযুক্ত শিক্ষক বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তবে ছাত্রীর বাড়িতে হামলা ও মারধরের বিষয়ে বিস্তারিত জানি না, খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবো।'
এ ব্যাপারে চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ লুৎফুর রহমানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তারা অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার ও ঘটনার পূর্ণ তদন্তের চেষ্টা করছেন, তবে স্থানীয় চাপ ও জটিলতার কারণে প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
এই ঘটনা নোয়াখালী অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, এবং স্থানীয় সম্প্রদায় ও কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে।



