কুমিল্লায় মাদ্রাসার দেয়াল ভেঙে পড়ে ১১ বছরের শিক্ষার্থীর মৃত্যু
কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলায় একটি মাদ্রাসার সংস্কারকাজের সময় দেয়াল ভেঙে পড়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে দেবীদ্বার পৌরসভার ছোট আলমপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। নিহত শিক্ষার্থী সিফাত হোসেনের বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।
মামলায় অভিযুক্ত তিন শিক্ষক পলাতক
দুর্ঘটনার পর নিহত শিক্ষার্থীর বাবা মাসুম আহমেদ মঙ্গলবার দুপুরে দেবীদ্বার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় মাদ্রাসার পরিচালক আনিসুর রহমান, শিক্ষক আজিজুর রহমান ও মুস্তাফিজুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে এই তিনজনই পলাতক রয়েছেন, ফলে তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রাসার ভেতরের একটি পুরোনো বিভাজক দেয়াল ভাঙার কাজ চলছিল। সোমবার সন্ধ্যায় কাজ করার সময় দেয়ালের একটি বড় অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে সিফাত হোসেনের ওপর। এতে সে গুরুতর আহত হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিক্ষার্থীদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের অভিযোগ
ওই মাদ্রাসার তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অদক্ষ শ্রমিক ও আবাসিক শিক্ষার্থীদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানোর অভিযোগ উঠেছে। দেবীদ্বারের ছোট আলমপুর এলাকায় একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলা ও দোতলা ভাড়া নিয়ে আনিসুর রহমান নামের এক ব্যক্তি ‘মাদরাসা কা-শিফুল উলুম’ পরিচালনা করেন। গতকাল সন্ধ্যায় মাদ্রাসাটির নিচতলায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত সিফাত হোসেন দেবীদ্বারের বড়শালঘর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বড়শালঘর গ্রামের ব্যবসায়ী মাসুম আহমেদের ছেলে ছিল। সে ওই মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিষ্ঠানে ১১৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের মধ্যে ১৮ জন আবাসিক। তিন শিক্ষক মাদ্রাসাটি পরিচালনা করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও তদন্তের দাবি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ভবনে থাকা এক ব্যক্তি বলেন, কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীদের দিয়ে ইট বহনসহ বিভিন্ন কাজ করানো হচ্ছিল। মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। প্রত্যক্ষদর্শী আবুল হোসেনের অভিযোগ, আহত হওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে সিফাত বাঁচতে পারত। কিন্তু আহত অবস্থায় তাকে ফেলে ঘটনাস্থলের রক্ত পরিষ্কারে ব্যস্ত ছিলেন মাদ্রাসার এক শিক্ষক। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার প্রাণ গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’ তিনি অভিযোগ করেন, ওই এলাকায় অন্তত ১৫টি মাদ্রাসা রয়েছে। এসব মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের কাপড় ধোয়ানো, মাদ্রাসার বিভিন্ন কাজ করানোসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে নজর দিতে তিনি প্রশাসনকে অনুরোধ জানান।
পুলিশের তৎপরতা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগে মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পুলিশ আবাসিক শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করেছে। ভবনের বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালানো হয়েছে। ঘটনার পর একটি পক্ষ মাদ্রাসা ভাঙার চেষ্টা করে। তবে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তখন অভিযুক্ত শিক্ষকেরা দ্রুত পালিয়ে যান।



