বোবা কাহিনী: ঔপনিবেশিক বাটখারায় নিম্নবর্গের বোবাকরণের কাহিনি
বোবা কাহিনী: ঔপনিবেশিক বাটখারায় নিম্নবর্গের বোবাকরণ

উপন্যাসের পটভূমি ও কাহিনিসংক্ষেপ

জসীমউদ্‌দীনের 'বোবা কাহিনী' (১৯৬৪) উপন্যাসের পটভূমি গত শতাব্দীর বিশ-ত্রিশ দশকের বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম। সেখানকার মুসলমান সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষ এই উপন্যাসের চরিত্র। জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, 'সেখানকার মুসলমান সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষ এই উপন্যাসের চরিত্র। তাঁদের বেঁচে থাকার যুদ্ধ এ উপন্যাসের বিষয়।'

আবদুল মোতালেব শেখের ভাষায়, 'এ উপন্যাসের নায়ক আজাহের এক ছিন্নমূল চাষীসন্তান। লাঞ্ছনা-বঞ্চনা বাল্যকাল থেকেই তার নিত্যসঙ্গী। তবুও সে স্বপ্ন দেখে সুখী জীবনের। তাই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করে যায় বেশি ফসল ফলিয়ে সুখের নাগাল পেতে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে পুত্র বছিরকে উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষ করার স্বপ্ন দেখে সে।'

সাবঅলটার্ন তত্ত্ব ও আজাহেরের বোবাকরণ

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের 'Can the Subaltern Speak?' প্রশ্নের আলোকে 'বোবা কাহিনী' বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বে 'সাবঅলটার্ন' বলতে সেসব মানুষ বা গোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা কেবল দরিদ্র নয়, বরং আধিপত্যশীল জ্ঞানব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, আইনি ভাষা ও ক্ষমতার স্বীকৃত পরিসর থেকেও বিচ্ছিন্ন। ফলে তাদের কণ্ঠস্বর থাকলেও তা সামাজিকভাবে শোনা, অনুবাদ, স্বীকৃত ও কার্যকর হয় না। এই অর্থেই আজাহেরের কাহিনি একটি সাবঅলটার্ন কাহিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছদের সূচনাবাক্য—'আজাহেরের কাহিনী কে শুনিবে?'—এই প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতারই ঘোষণা। প্রশ্নটি আলংকারিক; এর লক্ষ্যার্থ হলো আজাহেরের কাহিনি কেউ শোনে না, শুনবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ঔপনিবেশিক আইনের প্রভাব

উপন্যাসের কাহিনির সময় ঔপনিবেশিক আমল এবং সে আমলের আইন, বিশেষত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব ঘটনাপ্রবাহে বিদ্যমান। ১৮১৯ সালে বেঙ্গল প্রভিন্সের গভর্নর জেনারেল ফ্রান্সিস রওডন-হেস্টিংস রিপোর্টে লিখছেন—'Yet this truly benevolent purpose, fashioned with great care and deliberation, [the Permanent Settlement] has, to our painful knowledge, subjected almost the whole of the lower classes throughout these provinces to most grievous oppression, an oppression, too, so guaranteed by our pledge, that we are unable to relieve the sufferers.'

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালের রিপোর্টে বলেন, 'that insurrection or hostile opposition to the will of the ruling province may be affirmed to be an impossible danger.' তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে কৃতিত্ব দিয়ে বলেন, 'The Permanent Settlement, which, though a failure in many other respects and in its most important essentials, has this great advantage at least, of having created a vast body of rich landed proprietors deeply interested in the continuance of the British Dominion and having complete command over the mass of the people.'

কোম্পানির বাটখারা: বাজার, মাপ ও ভাষার ক্ষমতা

আজাহের পাট চাষ করে। পাটের ব্যাপারী অছিমদ্দী তাকে পাটের দাম কমিয়ে দিতে চায়। আজাহের জানে ফরিদপুরে পাটের দাম ছয় টাকা মণ। অছিমদ্দী তাকে দেয় মণপ্রতি সাড়ে চার টাকা। মাপের সময়ও হেরফের করে। আজাহের তার পাটের পরিমাণ আগেই মেপে রেখেছিল—ছাব্বিশ মণ। ব্যাপারীর পাল্লায় মাপ দেওয়ায় ওজন আসে বিশ মণ।

আজাহের দর-কষাকষি করতে গেলে ব্যাপারী কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করে। অছিমদ্দী বলে, 'তোমার পাট ত তেমুন বাল না। কোম্পানী-আলা পাট নিতিই চায় না।' এবং 'তোমার ভিজা পাট দেকলি পুলিশেই তোমাকে দৈরা দিব্যানে।' ওজন নিয়ে প্রশ্ন করলে অছিমদ্দী বলে, 'কোথাকার নকল পালা-পৈড়ান দিয়া তুমি ওজন দিছিলা। তাইতি ওজনে বেশী ঐছিল। একথা কারও কাছে কইও না, যে তোমার কাছে নকল পালা-পৈড়ান আছে। একথা পুলিশ জানতি পারলি এহনি তোমারে থানায় ধইরা নিয়া যাবি। আমার পালা-পৈড়ানে কোমপানি বাহাদুরের নাম লেহা আছে। ইংরাজী পড়বার পার মিঞার বেটা?'

স্পষ্টতই কোম্পানির বাটখারা, কোম্পানির ইংরেজি এবং কোম্পানির পুলিশ—ঔপনিবেশিক ক্ষমতা—কীভাবে একজন বর্গাচাষিকে সন্ত্রস্ত করে তোলে। আজাহের নিজের পক্ষের বক্তব্য ঔপনিবেশিক ক্ষমতার কাছে তুলে ধরতে পারে না, কেননা সে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে পারে না।

আদালত, চাপরাস ও প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা

আজাহের শরৎ সাহার কাছ থেকে পনেরো টাকা ঋণ নিয়েছিল। পাট বেচে টাকা ফেরত দিতে গেলে সাহা তাকে জমি কেনার দুর্বুদ্ধি দেয়। আজাহের টাকা দেয়, কিন্তু কোনো দলিল বা সাক্ষী রাখে না। পরে সাহা জমি ও ফসল অস্বীকার করে। আদালত থেকে পিয়ন এসে আজাহেরকে আসামি করে সমন দেয়। পাঁচ বছর পর সাহা আদালতের পিয়নসহ এসে বলে ঋণ চক্রবৃদ্ধি হারে পাঁচ শত টাকা হয়েছে।

পিয়নের 'মাজায় আদালতের ছাপমারা চাপরাশ ঝকমক করিতেছে'; ফলে 'কেহই আজাহেরকে কোন সাহায্য করিতে সাহস পাইল না।' পিয়ন বলে, 'আমরা যে গ্রাম-ভরে এতো বুকটান করে ঘুরি সে নিজের জোরে নয় মাতবর সাহেব! এই চাপরাশের জোরে।' সাহার লোকজন আজাহেরের ঘরের সব পুঁটলি বেঁধে গাড়িতে তোলে, টিনের চাল খুলে নেয়, বাড়ি দখলের ঘোষণা করে এবং হালের গরু দুটি নিয়ে যায়। আজাহের গরু দুটিকে 'বোবাধন' বলে ডাকে। গ্রামের লোকেরা 'নীরব দর্শকের মতই দাঁড়াইয়া রহিল। কোন কথাই বলিতে পারিল না।'

আজাহের মোড়লকে বলে, 'কাইল যখন দেখপ, আমার চাষ দেওয়া খ্যাতে অন্য মানষী হাল জুড়ছে, আমার এত আদরের গরু দুইডি অন্য লোকের খ্যাত চাষ করতাছে, ক্যামন কইরা তা আমি সহ্য করব মোড়ল বাই?' মোড়ল উত্তর দেয়, 'কি করবা আজাহের! রাজার আইন।'

বছির, শিক্ষা ও লোকায়ত আধুনিকতার সম্ভাবনা

বছির যখন উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন গ্রামের সব লোক আজাহেরের উঠানে আসে তাকে বিদায় জানাতে। গরিবুল্লা মাতবর বছিরকে বলেন, 'বাজান রে, আমরা বোবা। দুস্কের কথা কয়া বুজাইতে পারি না। তাই আমাগো জন্যি কেউ কান্দে না। তোমারে আমরা আমাগো কান্দার কান্দুইনা বানাইবার চাই।'

জসীমউদ্‌দীন নিজের লেখালিখি সম্পর্কে বলেন, 'দেশের অর্ধশিক্ষিত আর শিক্ষিত সমাজ আমার পাঠক-পাঠিকা। তাহাদের কাছে আমি গ্রামবাসীদের সুখ-দুঃখ ও শোষণ-পীড়নের কাহিনি বলিয়া শিক্ষিত সমাজের মধ্যে তাহাদের প্রতি সহানুভূতি জাগাইতে চেষ্টা করি। আর চাই, যারা দেশের এই অগণিত জনগণকে তাহাদের সহজ-সরল জীবনের সুযোগ লইয়া তাহাদিগকে দারিদ্র্যের নির্বাসনে ফেলিয়া রাখে, তাহাদের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষিত সমাজের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাইতে।'

বছির আরজান ফকিরের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে সাফল্যের মুখ দেখে। তার শিক্ষার লক্ষ্য ম্যালেরিয়ার জীবাণু নিয়ে গবেষণা করা, কেননা এটি তার গ্রামের একটি স্থানীয় সমস্যা। গ্রামের সবাই এই জ্বরের কবলে এবং তার নিজের বোন এই জ্বরেই মারা গেছে। এটি সর্বজনের সহায়তায় সর্বজনের সমস্যা দূরীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষালাভ এবং সেই শিক্ষার সুফল সর্বজনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার একটি লোকজ পন্থা।

উপসংহার

'বোবা কাহিনী' কেবল আজাহের নামের এক দরিদ্র কৃষকের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কাহিনি নয়; এটি ঔপনিবেশিক আইন, বাজার, ভাষা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্মিলিত ব্যবস্থায় নিম্নবর্গের বোবাকরণের কাহিনি। কোম্পানির বাটখারা এখানে শুধু ওজন মাপার যন্ত্র নয়; এটি বৈধতা, ভয়, ভাষা ও শাসনের রূপক। আজাহেরের পাট, জমি, গরু, ঘর—সবকিছু হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের বক্তব্যের সামাজিক কার্যকারিতাও হারিয়ে যায়। অন্যদিকে বছিরের শিক্ষা সম্ভাবনার দরজা খুললেও সেই সম্ভাবনা ব্যক্তিগত উত্তরণের সীমা অতিক্রম করে সামষ্টিক মুক্তির শর্ত তৈরি করতে পারে কি না, এই প্রশ্ন উপন্যাসটি খোলা রাখে।