কক্সবাজার সৈকত কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নয়; বরং এখানকার সাগরের নীল জলরাশি এবং তীরের বেলাভূমি মূল্যবান সম্পদের ভান্ডার। গবেষকেরা এখানকার কিছু এলাকার বালুতে মূল্যবান খনিজ ভান্ডারের সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত মোনাজাইটের মতো তেজস্ক্রিয় খনিজ। পাশাপাশি জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট, লিউকক্সিনসহ আরও সাত ধরনের খনিজও পাওয়া যায়, যেগুলো শিল্পকারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গবেষণার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
কক্সবাজারের বালুতে লুকিয়ে থাকা এই মূল্যবান খনিজ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮০ সালে কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কক্সবাজার খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র’ (বিএসএমইসি)। প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পার হলেও এই খনিজগুলোর কোনো বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা ও সম্ভাবনা যাচাইয়েই সীমাবদ্ধ আছে কক্সবাজারের এই ‘কালো সোনা’।
খনিজ ভান্ডারের অবস্থান
কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের (বিএসএমইসি) গবেষকেরা জানান, কয়েক দশক ধরে দেশের সমুদ্রসৈকত ও উপকূলে গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা ১৭টি জায়গায় বিরল খনিজ ভান্ডার আবিষ্কার করেন। এর মধ্যে ১৫টির অবস্থান কক্সবাজারে। অপর দুটি খনিজ ভান্ডার রয়েছে নিঝুম দ্বীপ ও কুয়াকাটায়। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সৈকত পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটারে পাওয়া গেছে ৬টি খনিজ ভান্ডার। এ ছাড়া মহেশখালীতে ৭টি, মাতারবাড়ীতে ১টি, কুতুবদিয়ায় ১টি ভান্ডারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বর্তমানে কক্সবাজারের ১৫টি খনিজ ভান্ডারের কোনোটির সীমানাপ্রাচীর কিংবা চিহ্ন নেই।
খনিজসম্পদের ধরন ও সম্ভাব্য মজুত
কক্সবাজার সৈকত থেকে গবেষকেরা ৮ প্রকারের খনিজ আহরণ করেছেন। এসব হলো পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য মোনাজাইট, রং, সিরামিক ও ঢালাইশিল্পের কাঁচামাল জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট ও নিউকক্সিন। গবেষণা অনুযায়ী, ১৭টি জায়গায় খনিজের সম্ভাব্য মজুত ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ৫ কোটি মেট্রিকটন। এর মধ্যে ভারী খনিজ বালুর পরিমাণ ৪৩ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিকটন। যার মধ্যে জিরকন ও মোনাজাইট ১৭ দশমিক ৬ লাখ টন। যার বাজারমূল্য ১৭ হাজার কোটি টাকা।
উত্তোলনে বাধা ও অবকাঠামোগত সমস্যা
কক্সবাজার খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক মো. গোলাম রসুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরমাণুবিজ্ঞানী ড. আবদুল ওয়াজেদ মিয়া ১৯৯৫ সালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কক্সবাজারে খনিজ বালি পৃথকীকরণের প্রকল্প চালু করেছিলেন। এরপর পাঁচ বছর আমরা খনিজসম্পদ নিয়ে গবেষণা করেছি। বাণিজ্যিকভাবে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের বিষয়ে তখন থেকে সরকারের কাছে নানা প্রস্তাব-সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত খনিজের বাণিজ্যিক আহরণ নিয়ে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি।’ বর্তমানে খনিজ ভান্ডার এলাকায় সড়ক, ভবনসহ নানা অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। সৈকতের পাশ ধরে ৮৪ কিলোমিটারের ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ’ নির্মিত হয়েছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, বদরমোকাম সৈকত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে। তাতে মূল্যবান খনিজসম্পদ চাপা পড়ছে।
গবেষণা কেন্দ্রের বেহাল দশা
কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শেখ জাফরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে কেন্দ্রের খনিজ বালু আহরণ প্রকল্প বন্ধ আছে। তবে সৈকত থেকে নমুনা (খনিজ) সংগ্রহ করে গবেষণা, ব্যবসার উন্নয়নে তথ্য সংগ্রহ এবং ল্যাবরেটরিতে সীমিত আকারে খনিজ বালু পৃথকীকরণের কর্মসূচি চালু রয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা কেন্দ্রে এসে প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করেন।’ শহরের কলাতলী সড়কের পূর্ব পাশে ১১ দশমিক ২ একর জমির ওপর প্রধান ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। ৮০ জনবলকাঠামোর এই কেন্দ্রে বর্তমানে আছেন একজন কেন্দ্র পরিচালক, একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, একজন টেকনিক্যাল কর্মকর্তাসহ ২৪ জন। কেন্দ্রের ভেতরের অবস্থা নাজুক। টানা আধা ঘণ্টা বৃষ্টি হলে পুরো কেন্দ্র হাঁটুপানিতে ডুবে থাকে। প্রধান ফটক থেকে কেন্দ্রের যাতায়াতের পাকা সড়কটি পানিতে নিমজ্জিত থাকায় হাঁটাচলা করা যায় না। বলতে গেলে পুরো বর্ষা মৌসুম কেন্দ্রটি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকে। কেন্দ্রের বাইরে খোলা মাঠে স্তূপ করে রাখা কয়েকটি খনিজ বালুও পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং সেগুলোতে জন্মেছে আগাছা।
সমন্বিত নীতিমালার অভাব
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন বিজ্ঞানী ও গবেষক বলেন, খনিজ সম্পদ আহরণে অতীতের কোনো সরকার বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। খনিজ আহরণের মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিও দেশে নেই। খনিজসমৃদ্ধ এলাকাগুলোকে ‘খনিজ সংরক্ষণ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত (ঘোষণা) করে সংরক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়, ভূমি ও জলবায়ু, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় দরকার। খনিজ সম্পদ আহরণ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা দরকার, যা বর্তমানে নেই।



