ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আটটি বিভাগকে একীভূত করে তিনটি বিভাগে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির এক সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে প্রস্তাবটি ঘিরে মতবিরোধও তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন, সমজাতীয় বিভাগগুলো একীভূত করা যেতে পারে। আবার অনেকের মতে, প্রয়োজনীয় গবেষণা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা ও একাডেমিক বৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রস্তাবের বিবরণ
প্রস্তাব অনুযায়ী, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, সংগীত, নৃত্যকলা, সংস্কৃত এবং পালি অ্যান্ড বৌদ্ধ স্টাডিজ—এই পাঁচটি বিভাগকে কলা অনুষদের অধীনে পুনর্গঠনের আলোচনা হয়েছে। অপরদিকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি এবং মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের আওতায় একীভূত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত ডিনস কমিটির সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ডিনদের বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। যদিও সভার মূল আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি ছিল না; ‘বিবিধ’ অংশে এ নিয়ে আলোচনা হয়।
শিক্ষকদের আপত্তি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, একীভূত করার পক্ষে যেসব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বলা হচ্ছে বাজারমূল্য কম, আগে একই বিভাগ ছিল, কিংবা শিক্ষার্থী কম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু একই যুক্তিতে উর্দু, ফার্সি বা আরবি বিভাগের বিষয়েও তো প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না।”
তার ভাষ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগই সময়ের সঙ্গে বড় বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে বিশেষায়িত বিভাগ হিসেবে গড়ে উঠেছে। “সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে নৃবিজ্ঞান, পপুলেশন সায়েন্স, ক্রিমিনোলজি হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান থেকেও একাধিক বিভাগ হয়েছে। তাহলে আগে এক ছিল—এই যুক্তিতে আবার এক করে দেওয়া হবে কেন?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জোবাইদা নাসরীন বলেন, “নাচ, সংগীত, থিয়েটার বা চলচ্চিত্রের মতো বিষয় স্বভাবগতভাবেই বিশেষায়িত। এসব বিভাগে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।” তার দাবি, যেসব বিভাগকে একীভূত করার আলোচনা হচ্ছে, সেখানে “এক ধরনের মতাদর্শিক ঝোঁক” কাজ করছে। তিনি বলেন, “নাচ, সংগীত, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, সংস্কৃত বা পালির মতো বিষয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। একই সময়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কোরআন স্টাডিজ, হাদিস স্টাডিজ, ইসলামিক ল'সহ নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে। একই যুক্তি সেখানে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।”
গবেষণার অভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মনে করেন, কোনও বিভাগ চালু, সম্প্রসারণ বা একীভূত করার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া উচিত নয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সম্ভবত ৮৭টি বিভাগ ও ১৩টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। কোন বিভাগ থাকবে, কোনটি একীভূত হবে বা নতুন বিভাগ প্রয়োজন কিনা—এসব নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করতে হবে।”
তার মতে, দুটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে—একটি হলো জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রয়োজন, অন্যটি কর্মবাজারের চাহিদা। তিনি বলেন, “দর্শন বিভাগের বাজারমূল্য হয়তো কম, কিন্তু সমাজে এর প্রয়োজনীয়তা তো অস্বীকার করা যায় না। তাই শুধু চাকরির বাজার নয়, জ্ঞান উৎপাদনের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
তিন বিভাগ এক করার যৌক্তিকতা নেই
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি এবং মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ একীভূত করার প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করেন খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, “টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত বিভাগ। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০টির মতো টেলিভিশন চ্যানেল সক্রিয়। চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফিও স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন। কিছু কোর্সে মিল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে।”
তার মতে, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে যেমন নৃবিজ্ঞান, পপুলেশন সায়েন্স ও ক্রিমিনোলজি আলাদা হয়েছে, তেমনি বিশেষায়িত জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনেই এসব বিভাগ গড়ে উঠেছে।
টপ-ডাউন নয়, বটম-আপ সিদ্ধান্ত
খোরশেদ আলমের মতে, বিভাগ একীভূত বা নতুন বিভাগ চালুর সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, “আগেও ওপর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। এখন আবার ওপর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভাগ বন্ধ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দুটি প্রবণতাই ভালো নয়।”
তার মতে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভাগ, কর্মবাজার এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রয়োজন—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “বিভাগ সম্প্রসারণ হোক বা সংকোচন—দুটোই হওয়া উচিত একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণার ভিত্তিতে। বাজারের চাহিদা এবং জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন—এই দুইয়ের সমন্বয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”



