ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের ৩৬ দফা ইশতেহার: সাত মাসেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই, শিক্ষার্থীদের হতাশা
চোখধাঁধানো ৩৬ দফা ইশতেহার এবং শিক্ষার্থীদের নানামুখী সমস্যা সমাধানের জোরালো আশ্বাস দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতৃত্বে আসে শিবিরসমর্থিত প্যানেল। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), জেনারেল সেক্রেটারি (জিএস), অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি (এজিএস) সহ মোট ২৮টি পদের ২৩টিতে বিজয়ী হয় তারা। শিবিরের ইশতেহার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করলেও গত সাত মাসে হতাশ হয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার পার্থক্য
দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট, হলের খাবারের নিম্নমান, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার প্রত্যাশায় শিক্ষার্থীরা ছিলেন উদগ্রীব। ডাকসুর দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও ইশতেহারগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মনে উঠেছে নানান প্রশ্ন। শিক্ষার্থীদের হতাশা এবং ইশতেহারের সিংহভাগই বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও নানা সীমাবদ্ধতার অভিযোগ তুলেছেন ডাকসুর ভিপি ও শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাদিক কায়েম।
এ বিষয়ে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, "আমাদের কিছু ইশতেহার বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কিছু বিষয়ে কাজ চলমান আছে। ডাকসুর অন্য নেতৃবৃন্দও নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে বিগত কয়েক বছরের ডাকসুর ফান্ডের হিসাব এবং পর্যাপ্ত বাজেট না পাওয়ায় কিছু কাজ করা যাচ্ছে না।"
ইশতেহারের বাস্তবায়নে ধীরগতি
ঘোষিত ৩৬ দফার মধ্য থেকে কিছু ইশতেহার বাস্তবায়ন করলেও বেশির ভাগই এখনো বাস্তবায়নের বাইরে। এক বছর মেয়াদের অর্ধেকের বেশি সময় পার করলেও ইশতেহারের বেশির ভাগ কাজ এখনো শুরুই করতে পারেনি ডাকসু। এ অবস্থায় বাকি ইশতেহার বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ইকোনমিকস বিভাগের শিক্ষার্থী নবনীতা চক্রবর্তী বলেন, "ডাকসু নির্বাচন হলেও আদতে শিক্ষার্থীদের তেমন লাভ হয়নি। অনেক ইশতেহার আমরা পেয়েছি কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিফলন দেখিনি। ভাসমান দোকান সমস্যা, অস্বাস্থ্যকর খাবার সমস্যা নিরসন, প্রিমিয়াম হওয়ার পরেও স্বাস্থ্যবিমা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন ইত্যাদি আমাদের প্রত্যাশা ছিল। আমরা আসলে হতাশ।"
বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর আকন বলেন, "নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের কাছে অনেক আকর্ষণীয় ইশতেহার উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ইশতেহারগুলো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার চেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল।"
গুরুত্বপূর্ণ ইশতেহারগুলোর অগ্রগতি
ছাত্রশিবিরের দেওয়া ৩৬টি ইশতেহার বিশ্লেষণ করা দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
- আবাসন সংকট: ইশতেহার অনুসারে, প্রথম বর্ষ থেকেই সব শিক্ষার্থীর বৈধ আবাসন নিশ্চিত অথবা অস্থায়ীভাবে হল কিংবা আবাসনভাতা এবং দীর্ঘমেয়াদে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা আছে। প্রথম বর্ষ থেকে আবাসন নিশ্চিত করতে না পারলেও উল্লিখিত বিকল্প কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারেনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর প্রকল্পের আওতায় নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যেটি ডাকসু হওয়ার আগে গত বছরের ২৭ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়।
- খাবারের মানোন্নয়ন: হল ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে মানসম্মত খাবার নিশ্চিতেও গত সাত মাসে ব্যর্থ ডাকসু। তাদের ইশতেহার অনুসারে হল ও ক্যাম্পাসে স্বল্পমূল্যে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত, প্রতি তিন মাসে খাবারের মান পরীক্ষার কথা থাকলেও কোনটিই নিশ্চিত করতে পারেনি তারা।
অন্যান্য ইশতেহারের অবস্থা
ক্যাম্পাস এরিয়ায় বহিরাগত যান-নিয়ন্ত্রণ, রেজিস্ট্রার্ড রিকশা প্রবর্তনের কথা থাকলেও সেটিও গত সাত মাসে বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়াও তাদের দেওয়া ইশতেহার অনুসারে:
- ছাত্রী হলে পুরুষ কর্মচারী যথাসম্ভব কমিয়ে আনা এবং প্রক্টরিয়াল টিমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারী সদস্য নিয়োগ দেওয়া, ছাত্রীদের জন্য ছাত্রী হলে প্রবেশের বিধি-নিষেধ শিথিল করা।
- লাইব্রেরি সমূহ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসা, হলভিত্তিক সমস্যা সমাধানে গ্রিডেন্স রেসপন্স টিম গঠন করা।
- জরাজীর্ণ বাসগুলো বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস ক্রয় করা, মোবাইল অ্যাপে বাসের রিয়েলটাইম ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা করা।
- প্রশাসনিক ভবনের সেবাকেন্দ্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নিরসন করে 'পেপারলেস রেজিস্ট্রার বিল্ডিং' গড়ে তোলা, আইনি সহায়তায় 'লিগ্যাল হেল্প ডেস্ক' স্থাপন করা।
- টিএসসির নিকটবর্তী ছাত্রী হল ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অবস্থান বিবেচনায় সাউন্ড বক্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করা।
এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। শিক্ষার্থীদের আশা ছিল যে ডাকসু তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।



