এবারও পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর মিছিল আমাদেরকে সড়কের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের চিত্রকে আরও একবার সামনে নিয়ে এল। প্রথম আলোর পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, ছুটির সাত দিনে (২৫ মে–৩১ মে) সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৯ জন, আহত হয়েছেন ১৩৫ জন। সড়কে মৃত্যুর এই মিছিলে শিশু, কিশোর, নারী, তরুণ, বয়স্ক নাগরিক সবাই রয়েছেন। এটাকে নিছক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি না। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে এমন ট্র্যাজেডি কি আমাদের নিয়তির অংশ হয়েই থাকবে?
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা
এবারের ঈদযাত্রার শুরুর দিনে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে নিহত হন ১৫ জন। এটি ছিল এবারের ছুটির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। শুরুর এই ধারাবাহিকতা ছুটির শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এমনকি ঈদের দিনে সড়কে প্রাণ হারান ১৮ জন। বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা—সড়কে চলাচল করা কোনো যানবাহনই দুর্ঘটনামুক্ত ছিল না।
পরিবহন সংকট ও বিকল্প গণপরিবহন
পরিবহনবিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, ঈদের ছুটিতে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়েন। এর বিপরীতে আমাদের গণপরিবহন, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি মিলিয়ে সক্ষমতা আছে মাত্র ২২ লাখ। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যানে যেতে হয়। এ রকম একটি বাস্তবতায় ঈদের আগে সড়কে শৃঙ্খলা ধরে রাখা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। এবারের ঈদযাত্রায় মহাসড়কগুলোতে ঘরমুখী মানুষের ভোগান্তি এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তবে ঈদের দিন কিংবা ছুটি শেষে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
সারা বছরের শৃঙ্খলা চর্চার অভাব
এবারের ঈদের ছুটিতেও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির এই ভয়াবহ চিত্র বলছে, সারা বছর সড়কে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য জিইয়ে রেখে ঈদের ছুটিতে শৃঙ্খলার আশা করাটা নিছক কল্পনাবিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা মনে করি, পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান যথার্থই বলেছেন, সড়কে শৃঙ্খলার বিষয়টি সারা বছরের চর্চার বিষয়।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বৃদ্ধি
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মোটরসাইকেলের কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রায় ৪১ শতাংশই মোটরসাইকেলের কারণে। মহাসড়কে গণপরিবহন–সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে মোটরসাইকেলকে বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহারের কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্ঘটনা বেড়েছে। এ ছাড়া অভিভাবকদের অনেকে তাঁদের কিশোর বয়সী সন্তানদের হাতে কোনো বিবেচনা ছাড়াই মোটরসাইকেল তুলে দিচ্ছেন, প্রশিক্ষণ ছাড়াই সড়কে বেপরোয়া গতিতে চালাতে গিয়ে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন। মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে হলে সরকারকে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ট্র্যাজেডি
উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারাচ্ছেন, যাঁরা আহত হচ্ছেন, তাঁদের সিংহভাগই কর্মক্ষম ব্যক্তি। বুয়েটের এক গবেষণা বলছে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় কথা, একেকটি দুর্ঘটনা একেকটি পরিবারের জন্য সীমাহীন ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়ে চলেছে।
প্রতিকারের পথ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা
সড়কে দুর্ঘটনার কারণ কী, এর থেকে উত্তরণের উপায় কী, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, করণীয়ও ঠিক হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাস্তবায়নে কোনো উদ্যাগ নেওয়া হয়নি। এর কারণ হলো পরিবহন খাতের একটি গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের স্বার্থে নীতিনির্ধারকেরা জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে আসছেন। এখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমাদের সড়কব্যবস্থার অসুখ সারাতে নতুন ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ নয়, দরকার ব্যবস্থাটিকে বদলানোর উদ্যোগ।



