ইসলামে বিপর্যয় সৃষ্টি ও দুর্নীতির কঠোর নিষেধাজ্ঞা
ইসলামে বিপর্যয় সৃষ্টি ও দুর্নীতির নিষেধাজ্ঞা

প্রাক-ইসলামি আমলে এমন অনেক জাতি ছিল, যারা শক্তি, প্রাচুর্য ও অহমিকায় মত্ত ছিল। তারা দিগ্বিদিকে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে, রাজত্বের সীমানা বিস্তার করেছে এবং অন্য জাতির ঐশ্বর্য-সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। তাদের অনুসৃত পদ্ধতি ছিল বর্বর ও পাশবিক। কোনো ন্যায়নীতির তোয়াক্কা তারা করত না।

বিভিন্ন শহর দখল করার সময় তারা নাগরিক স্থাপত্য ও সভ্যতা অবলীলায় ধ্বংস করে দিত। মানুষের ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করত এবং স্থানীয়দের দাসে পরিণত করত। বিজয়ের পর তারা এমন প্রশাসক নিযুক্ত করত, যারা সাধারণ মানুষের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালিয়ে যেত।

ইতিহাসের বাস্তবতা

ইতিহাসজুড়ে বিজয়ী শক্তিগুলোর চরিত্র ছিল এমনই। প্রাচীন শেবা নগরের রানি বিলকিস এই বাস্তবতাই ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যখন তাঁর কাছে সোলাইমান (আ.)-এর চিঠি পৌঁছেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজা-বাদশাহরা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে, তখন তা বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদের অপদস্থ করে।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৩৪)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসলাম কঠোরভাবে দুর্নীতি ও বিপর্যয় সৃষ্টির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। ইসলাম তার অনুসারীদের অন্তর থেকে এই ঘৃণ্য ব্যাধি আমূলে উপড়ে ফেলেছে। প্রতি যুগেই বিভিন্ন জাতির হাতে সংঘটিত এমন নৃশংসতা ও বর্বরতার গল্পে ইতিহাস পরিপূর্ণ।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

এর বিপরীতে ইসলামের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইসলাম কঠোরভাবে দুর্নীতি ও বিপর্যয় সৃষ্টির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। ইসলাম তার অনুসারীদের অন্তর থেকে এই ঘৃণ্য ব্যাধি আমূলে উপড়ে ফেলেছে। তাদের দেখিয়েছে এমন এক মানবিকতার পথ, যা কোনো ধরনের শত্রুতা বা বৈরী মনোভাবের কারণে ক্ষুণ্ণ হয় না। দুর্নীতি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করাকে অন্যতম সামাজিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কোরআনের নির্দেশনা

পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে এ বিষয়ে সাবধান করা হয়েছে। বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের নিন্দা করে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কিত যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং সে তার অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে, অথচ সে ব্যক্তি খুবই ঝগড়াটে। যখন সে ফিরে যায়, তখন দেশের মধ্যে বিপর্যয় ঘটাতে এবং শস্যাদি ও পশুসমূহ ধ্বংস করতে চেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ বিপর্যয় পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০৪-২০৬)

আল্লাহ মুসলমানদের সতর্ক করেছেন, তারা যেন অন্য কোনো জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী আচরণ না করে; ধ্বংস না করে তাদের নগর ও সভ্যতা। কারণ, এ ধরনের আচরণ একসময় তাদের নিজেদেরই অভ্যন্তরীণ বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেবে।

‘তবে কি তোমরা প্রত্যাশা করছ যে, যদি তোমরা শাসনক্ষমতা পাও, তবে জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে?’ (সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২২-২৩)

প্রাচীন জাতিগুলোর পতনের কারণ

প্রাচীন জাতিগুলোর পতন ও ধ্বংসের সূচনা হয়েছিল মূলত সেই সব অবদমিত জনগোষ্ঠী থেকেই, যাদের ওপর তারা নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। এই মূলনীতির দিকেই ইঙ্গিত দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘উপদেশ দেওয়ার পর আমি যাবুর গ্রন্থে লিখে দিয়েছিলাম যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দারাই পৃথিবীর উত্তরাধিকার লাভ করবে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৫)

প্রকৃত মুমিনদের সঙ্গে আল্লাহর আচরণ বিপর্যয়কারীদের চেয়ে ভিন্ন। বিশ্বাস ও বিপর্যয় যে দুটি আলাদা পরিচয়, তা তুলে ধরে আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান আনে ও সৎকাজ করে, আমি কি তাদের ওই সব লোকের মতো গণ্য করব যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে? আমি কি মুত্তাকিদের অপরাধীদের সমান করব?’ (সুরা সাদ, আয়াত: ২৮)

শান্তি ও শৃঙ্খলার আদেশ

যে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান, সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি না করার সরাসরি আদেশ দেওয়া হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপিত হওয়ার পর জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৬) এই নিষেধাজ্ঞার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় যখন পরকালে মুক্তির শর্ত হিসেবে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি না করার বিষয়টি জুড়ে দেওয়া হয়।

আল্লাহ বলেন, ‘সেই পরকালের বাসস্থান (জান্নাত) আমি তাদের জন্যই নির্ধারণ করেছি, যারা পৃথিবীর বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম কেবল আল্লাহভীরুদের জন্য।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৮৩)

শাসকদের জন্য নির্দেশনা

মুসলমানরা যখন নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসনে থাকবে, তখন তারা যেন স্বেচ্ছাচার ও বিপর্যয়ের পথ অবলম্বন না করে, সে বিষয়ে সাবধান করে আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তোমরা প্রত্যাশা করছ যে, যদি তোমরা শাসনক্ষমতা পাও, তবে জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এদেরই আল্লাহ লানত করেছেন, ফলে তাদের বধির ও দৃষ্টিহীন করে দিয়েছেন।’ (সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২২-২৩)

লক্ষণীয় যে এই আয়াতে কোরআনের অনন্য এক অলৌকিকতা নিহিত। এখানে শাসনক্ষমতা লাভের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমা এর সত্যতা প্রমাণ করেছে। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে পূর্ব ও পশ্চিমের বহু সাম্রাজ্যের শাসকেরা শাসনভার গ্রহণের প্রথম প্রহরেই নিজের আত্মীয়স্বজনকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার যে নিষ্ঠুর উৎসবে মেতে উঠতেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে।

কোরআনের অলৌকিকতা

কোরআন যে মহান আল্লাহর বাণী, তার অন্যতম প্রমাণ হলো জনপদের উন্নয়ন, সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি না করার এই নির্দেশাবলি এমন এক আরব ভূখণ্ড থেকে ঘোষিত হয়েছিল, যা কোরআন নাজিলের সময়ে নাগরিক সভ্যতা ও উন্নয়নের ছোঁয়াশূন্য ছিল। কোরআনের বারবার তাগিদ দেওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে এক জোরালো ইঙ্গিত ছিল যে, ভবিষ্যতে মুসলমানরা উন্নত ও সুসভ্য জাতিসমূহের সংস্পর্শে আসবে। বাস্তব চিত্রও তা-ই ছিল।

মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর মাত্র এক শতাব্দীর কম সময়ে ইসলামের বিজয় অভিযান পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে তারা অসংখ্য নগর, সভ্যতা, রাজপ্রাসাদ ও উপাসনালয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো তারা অক্ষত রেখেছিল। রাসুল (সা.) যুদ্ধের সেনাপতিদের নির্দেশ দিতেন যেন কোনো গাছ কাটা না হয়, কোনো স্থাপনা ধ্বংস না করা হয়। (ওয়াকিদি, কিতাবুল মাগাজি, ১/১১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ২০০৪) এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন ও বিপর্যয় সৃষ্টিকে মহানবী (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৪)

এটাই প্রমাণ করে যে, ইসলামই সেই সর্বজনীন ধর্ম, যা সমগ্র মানবজাতিকে নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলার চাদরে আগলে রাখতে সক্ষম।