জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অটোপাশ দাবিতে উপাচার্য অবরুদ্ধ, ৩৫ জন আহত
গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহকে অটোপাশের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আধঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তা কর্মীসহ অন্তত ১০ জন এবং শিক্ষার্থী ২৫ জন আহত হয়েছেন। মোট আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে। ঘটনাটি সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঘটে, যখন উপাচার্য গাজীপুর ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি ও আন্দোলনের পটভূমি
২০২৩ সালের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের বেশ কিছু শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে অটোপাশের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১০ শতাংশ গ্রেস মার্ক দিয়ে ফল প্রকাশ করলে অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু যারা ব্যর্থ হয় তারা অটোপাশ দাবি করে বিক্ষোভ চালিয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা খাতা দেখানোর উদ্যোগের পরিবর্তে সরাসরি অটোপাশ চায়, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে উপাচার্য তার কার্যালয় থেকে বের হলে শিক্ষার্থীরা তার গাড়ির চারপাশে ঘিরে ধরে এবং কিছু শিক্ষার্থী গাড়ির নিচে শুয়ে পড়ে। তারা উপাচার্যকে আধঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখে এবং নাজেহাল করে। কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মী ও কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের সরাতে গেলে সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর রেজাউর রহমান মিয়া, শৃঙ্খলা দপ্তরের পরিচালক মো. কামাল হাসান, আনসার সদস্য হুমায়ূন কবির, নিরাপত্তা কর্মী নূর মোহাম্মদ, শাহ পরাণ, জুয়েল, হোসনা বেগম, কনক রায়সহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহতদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ও অভিযোগ
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ভাবনা রহমান জানান, তারা সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও কেউ সাড়া দেয়নি। উপাচার্যের গাড়ি ঘিরে তারা তার সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করে, কিন্তু তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তা কর্মীরা হামলা চালায়। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয়, নারী শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত দেওয়া হয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, যার ফলে অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন। শিক্ষার্থীরা এই হামলার বিচার দাবি করেন।
শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি
- প্রকাশিত ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন করে গ্রেস মার্ক দিয়ে পাশ নিশ্চিত করতে হবে।
- এক বিষয়ে ফল আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের বিশেষ বিবেচনায় পাশ নিশ্চিত করতে হবে।
- পরীক্ষার উত্তরপত্র শিক্ষার্থীদের দেখার সুযোগ দিতে হবে।
- দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করে প্রিলিমিনারি থেকে মাস্টার্সে ভর্তির সুযোগ দিতে হবে।
উপাচার্যের প্রতিক্রিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান
ঘটনার পর উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীদের অন্যায্য দাবির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহানুভূতি দেখাতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অটোপাশকে সমর্থন করে না এবং শিক্ষার গুণগতমান বজায় রাখতে অটোপাশ ও গ্রেস মার্ক নিরুৎসাহিত করছে। তিনি সতর্ক করেন যে, অটোপাশ দিলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ব্যাপারে আরও কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
পুলিশের হস্তক্ষেপ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
গাছা থানার ওসি মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উপাচার্যের গাড়িসহ কর্মকর্তাদের নিরাপদে বের করে গন্তব্যে পাঠায় এবং শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়। এভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
পূর্বের ঘটনা ও প্রাসঙ্গিকতা
উল্লেখ্য, গত বছর ২১ মে অটোপাশের দাবিতে আন্দোলনরত ২০২২ সালের স্নাতক পরীক্ষার্থীদের হামলায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ প্রথমবারের মতো আহত হয়েছিলেন। এটি দেখিয়ে দেয় যে অটোপাশ ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে উত্তপ্ত হয়ে আছে এবং বারবার সংঘাতের সৃষ্টি করছে।
শিক্ষার্থীরা দাবি করছে, সেশনজট ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে তাদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার মান বজায় রাখতে অটোপাশের বিরোধিতা করছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝে আহতদের চিকিৎসা ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানানো হচ্ছে।



