রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসুর সেমিনারে ফুয়াদ ও শিশির মনিরের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের লাল কার্ড প্রদর্শন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসুর সেমিনারে শিক্ষার্থীদের লাল কার্ড প্রতিবাদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসুর সেমিনারে বিতর্কিত অতিথিদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু) আয়োজিত একটি সেমিনারে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শিশির মনিরকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোয় শিক্ষার্থীদের একাংশ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। আজ সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বরের সামনে প্যারিস রোডে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন এবং ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সেমিনারের প্রেক্ষাপট ও প্রতিবাদের কারণ

‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি: সংকটের পথে দেশ’ শীর্ষক এই সেমিনারে ফুয়াদ ও শিশির মনিরের উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন, যার মধ্যে ‘আবরারের আত্মত্যাগ, জুলাইয়ের প্রেরণা’, ‘খুনিদের আইনজীবী, চাই না, চাই না’ এবং ‘খুনিদের পক্ষ নেওয়া লজ্জার, খুনিদের রক্ষাকারীদের ধিক্কার’ উল্লেখযোগ্য। রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান ব্যাখ্যা করেন যে, ফুটবল খেলায় নিয়ম ভঙ্গ করলে যেমন লাল কার্ড দেখানো হয়, তেমনি অন্যায় ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও প্রতীকীভাবে লাল কার্ড প্রদর্শন করা হচ্ছে।

শিশির মনির আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় খুনিদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। অন্যদিকে, আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে স্বীকার না করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বক্তব্যের জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন যে, রাকসুর উচিত ছিল নিরপেক্ষ থাকা এবং গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি আয়োজন করা, কিন্তু বিতর্কিত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তারা এই নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছাত্রদলের সমর্থন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ছাত্রদলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বিজয়-২৪ হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গাজী হাসান ফেরদৌস বলেন, ‘রাকসুর উদ্যোগে আজকের সেমিনারে বাংলাদেশের বিজয় দিবসবিরোধী এবং অবমাননাকারী ফুয়াদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী শহীদ আবরার ফাহাদের খুনিদের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনিরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁদের লাল কার্ড প্রদর্শন করেছে এবং আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি।’

সেমিনারে বক্তব্য রাখার সময় আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে বিএনপিকেও ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। গত ১৭ বছরের জেল-জুলুম, গুম ও খুনের ইতিহাস এত দ্রুত ভুলে গিয়ে আপনারা গোল্ডফিশকেও হার মানিয়েছেন। আপনাদের মধ্যে আমরা বেগম জিয়াকে খুঁজে পাচ্ছি না। সংসদে আপনাদের সংবিধানবিশেষজ্ঞদের মধ্যেও জিয়াউর রহমানের প্রতিফলন নেই। এই বিএনপি বাংলাদেশপন্থী বলে মনে হয় না। আমরা সেই বিএনপিকে দেখতে চাই, যারা ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করবে।’

শিক্ষার্থীদের লাল কার্ড প্রদর্শনের প্রসঙ্গে ফুয়াদ মন্তব্য করেন, ‘আমার তরুণ বন্ধুদের বলতে চাই, লাল কার্ড কাকে দেখাতে হবে, সেই বুদ্ধিও আপনাদের হয় নাই। সংবিধানের নামে আপনার দল যারা বিক্রি করে দিচ্ছে, আপনি তাদের লাল কার্ড দেখান। বুদ্ধি থেকে থাকলে সংসদের সামনে গিয়ে লাল কার্ড দেখান; আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হলে প্রয়োজনে রাকসুর ফান্ডে আপনাদের পাবনায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।’

অন্যদিকে, শিশির মনির বলেন, ‘বিএনপি এমন একদল মানুষের হাতে পড়েছে, যাদের আচরণ দিশাহীনতার পরিচয় দেয়। তাদের বক্তব্যে মনে হয়, তারা বিশ্বের গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নয়। অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও সংবিধান কীভাবে পুনর্গঠন করতে হয় কিংবা প্রয়োজনীয় সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে তারা যুক্তির চেয়ে শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতিতে বেশি ঝুঁকছে।’

সামগ্রিক প্রভাব ও শিক্ষার্থীদের অবস্থান

এই ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি উল্লেখযোগ্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। তারা দাবি করছেন যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাকসুর এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা লাল কার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

এই ঘটনা রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অনেকের মতে, ছাত্র সংগঠনগুলোর উচিত শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং সমাজের মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, যা এই ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পালন করা হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে।