মেঘনায় যুবক হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল এলাকা, গ্রেপ্তার না হওয়ায় বিক্ষোভ
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মুগারচর গ্রামে ওরস মাহফিলে নারীদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় শাহজালাল ওরফে সাব্বির (২০) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পার হলেও পুলিশ প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল বুধবার মেঘনা উপজেলা পরিষদ ও মেঘনা থানার সামনে বিক্ষোভ মিছিল, থানা ঘেরাও, প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন এলাকাবাসী।
বিক্ষোভ মিছিল ও থানা ঘেরাও
গতকাল বেলা ১১টার দিকে বিক্ষোভ মিছিলটি উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মুগারচর কে আলী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে মেঘনা থানার সামনে গিয়ে থানা ঘেরাও করা হয়। পরে উপজেলা পরিষদের সামনে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আসামিরা গ্রেপ্তার না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। এই বিক্ষোভে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকরা অংশগ্রহণ করেন, যা এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত ঘটনা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মার্চ রাতে মুগারচর গ্রামে আলী শাহ ভাণ্ডারীর ওরস মাহফিল চলাকালে লক্ষ্মণখোলা গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে মো. নাঈম প্রায় ১৫ জন সহযোগী নিয়ে ওরসে আসা নারীদের উত্ত্যক্ত করেন। এ সময় গ্রামবাসীর সঙ্গে শাহজালাল ওরফে সাব্বিরও প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ওরস থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
পরদিন ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় শাহজালাল কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মানিকারচর গ্রামের একটি ওরসে যাওয়ার পথে লক্ষ্মণখোলা গ্রামের মোড়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ওত পেতে থাকে। সেখানে নাঈম, বাবুল মিয়া, জাহিদুল, কামাল মিয়া, সজীব, লিল মিয়া, ফিরোজ মিয়াসহ অন্তত ১৫ জন মিলে অটোরিকশার গতি রোধ করে শাহজালাল ও তাঁর সহপাঠীদের নামিয়ে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়।
আহতদের অবস্থা ও মামলার অগ্রগতি
আহত ব্যক্তিদের প্রথমে মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে শাহজালাল ওরফে সাব্বির মারা যান। আহত জাহিদ এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যা এলাকাবাসীর মধ্যে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এ ঘটনায় আহত জিহাদের বাবা রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মেঘনা থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নাঈমের বাবা বাবুল মিয়াকে (৪৫) গত শনিবার দিবাগত রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন বিকেলে তাঁকে কুমিল্লা আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। তবে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি জামিনে মুক্তি পান। প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিক্ষোভের দাবি জোরদার হচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য ও চলমান তদন্ত
মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে থানা–পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে এলাকাবাসী পুলিশের এই পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত মনে করছে, যা বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।
এই হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী বিক্ষোভ মেঘনা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন যে, কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পুলিশ ও প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের আশা প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী, অন্যথায় আরও বড় আন্দোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।



