গাইবান্ধায় ভিজিএফ চাল বিতরণ নিয়ে চরম উত্তেজনা: চেয়ারম্যানের কান্নার ভিডিও ভাইরাল
গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভিজিএফের চাল সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করতে না পেরে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তালেব মন্ডল। এ ঘটনায় তার হাউমাউ করে কান্নার একটি মর্মস্পর্শী ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যা ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভিডিওতে ধরা পড়েছে চেয়ারম্যানের মর্মান্তিক কান্না
বুধবার (১৮ মার্চ) গভীর রাতে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিতে স্পষ্ট দেখা যায়, উপস্থিত জনতার সামনে চেয়ারম্যান আবু তালেব মন্ডল অঝোরে কাঁদছেন এবং ভিজিএফের চাল বিতরণে বাধার তীব্র অভিযোগ করছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাপমারা ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত মোট ২ হাজার ৭৮৮টি ভিজিএফ স্লিপের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ের বণ্টন অনুযায়ী ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৫৫৮টি স্লিপ বিএনপির জন্য আলাদাভাবে রাখা হয়। বাকি ২ হাজার ২৩০টি স্লিপ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মধ্যে নিয়মিতভাবে বণ্টন করা হয়, যেখানে প্রত্যেক সদস্যকে ২০০টি করে স্লিপ দেওয়া হয়।
বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক স্লিপ নেওয়ার অভিযোগ
তবে অভিযোগ উঠেছে, সাপমারা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক সারোয়ার হোসেন চৌধুরী দলীয় অংশ নেওয়ার পরও চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বরাদ্দে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। তিনি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ২০০টি এবং প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে ২০টি করে স্লিপ জোরপূর্বক নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য সুমি আক্তার, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ফরিদা বেগম এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০টি করে স্লিপ দাবি করেন।
সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য সুমি আক্তার বলেন, "দলীয় বরাদ্দ নেওয়ার পরও আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে জোর করে স্লিপ নেওয়া হয়েছে। পরে আবার অতিরিক্ত স্লিপ দাবি করা হয়। বিষয়টি আমরা উপজেলা প্রশাসনকে জানালে তিনি আরও ক্ষিপ্ত হন।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, "৩০-৪০ জন সমর্থক নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে এসে সারোয়ার হোসেন চৌধুরী চাল বিতরণ বন্ধ করে দেন এবং চেয়ারম্যানসহ সদস্যদের একটি কক্ষে আটকে রেখে হুমকি-ধমকি দেন।"
চাল বিতরণে বাধা ও হুমকির ঘটনা
সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য ফরিদা বেগম বলেন, "আমার কাছে ২০০ জন মানুষের তালিকাও আইডি ছিল। কিন্তু সারোয়ার আমাকে ৯০টি স্লিপ বিতরণের কথা বলেন এবং ৩০টির চাল তুলে নিতে বলেন। অবশিষ্ট ৮০টি স্লিপের কথা জানিয়ে বারবার ফোন করে স্লিপ চান। আমি কোনো স্লিপ দেইনি।"
এ বিষয়ে সাপমারা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তালেব মন্ডল বলেন, "বিএনপি ৫৫৮টি স্লিপ নেওয়ার পরও সারোয়ার আমার কাছ থেকে ২০০টি এবং প্রতিটি মেম্বারের কাছ থেকে ২০টি করে স্লিপ নিয়েছে। আমরা ভয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। এরপরও আরও তিন সদস্যের থেকে ৩০০ স্লিপ দাবি করা হয়। না দেওয়ায় চাল বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরিষদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমি সুষ্ঠুভাবে চাল বিতরণ করতে পারিনি। পরে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। বিষয়গুলো জানাজানি হলে পরে প্রশাসন ও কিছু রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় চাল বিতরণ করি। কিন্তু শেষ করতে পারিনি। আজও ১৪২ বস্তা চাল বিতরণ করতে হবে।"
বিএনপি নেতার প্রতিক্রিয়া: সব অভিযোগ মিথ্যা
অভিযোগের বিষয়ে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক সারোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, "সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কোনো স্লিপ নেইনি বা কাউকে হুমকিও দেইনি। চেয়ারম্যান তার লোকজন দিয়ে ফেসবুকে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছেন।" তিনি আরও দাবি করেন, "মন্ত্রী আসার সুযোগে চেয়ারম্যান কয়েকজন দালালকে নিয়ে চাল বিতরণ শুরু করেন। এছাড়া নারী ইউপি সদস্য সুমি নিজের ওয়ার্ড বাদ দিয়ে যারা বিক্রি করতে পারবে তাদের প্রত্যেককে ৫/৬টি করে ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৬১টি এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ২৬টি স্লিপ দিয়েছে। বিষয়গুলো ধরা পড়লে তিনি ভুল স্বীকারও করেছেন।"
স্থানীয়দের দাবি: নিরপেক্ষ তদন্ত চাই
এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জোর দাবি জানাচ্ছেন, একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ভিজিএফের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এমন অনিয়ম দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলতে পারে।



