পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণে ছয় বছরেও অগ্রগতি নেই, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আটকে
শরীয়তপুরবাসীর জন্য ঢাকার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল পদ্মা সেতু। সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দিতে ২০২০ সালে হাতে নেওয়া হয়েছিল জেলা শহর থেকে পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার সংযোগ সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নির্মাণকাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। এমনকি এক দফা সময় বাড়িয়েও প্রকল্পের সুফল ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি, উল্টো জুনে শেষ হতে যাওয়া দ্বিতীয় দফার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।
ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা প্রকল্পের মূল বাধা
প্রকল্পটির এই দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বের মূলে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা। শরীয়তপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, ২৭ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় এখনো জমি বুঝে না পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে পারছেন না। জেলা প্রশাসনের গাফিলতি হোক বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা—ভূমি অধিগ্রহণের মতো প্রাথমিক একটি প্রক্রিয়া কেন পাঁচ-ছয় বছরেও সম্পন্ন হবে না, সেই প্রশ্ন তোলা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ওই ছয় কিলোমিটার অংশে সড়কের অবস্থা এতটাই নাজুক ও বিপজ্জনক যে খানাখন্দ আর ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠছে এবং দৈনন্দিন যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর সড়কের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই সংযোগ সড়কের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। শুধু শরীয়তপুর নয়; মাদারীপুর, বরিশাল ও চাঁদপুরের একাংশের মানুষ এখন এই পথ ব্যবহার করে ঢাকায় যাতায়াত করছেন। প্রতিদিন হাজারো যানবাহন, যার মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস অন্তর্ভুক্ত, এই সরু ও ভাঙা পথে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। এই যানবাহনগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করছে, যার ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে সড়কে আটকে থাকতে হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।
বিশাল বাজেটের কাজ কেন ঝুলে আছে?
প্রশ্ন হচ্ছে, ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের কাজ কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে? সড়কটি জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা আরও এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা প্রকল্পের সময়সীমা ও ব্যয় বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই যে সময়ের অপচয় ও অদক্ষতা, এর দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে, যারা উন্নয়নের নামে দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
জনস্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত সমাধান কাম্য
আমরা আশা করব, জনস্বার্থ বিবেচনা করে সরকার ভূমি অধিগ্রহণ–সংক্রান্ত সব আইনি জটিলতা দ্রুত নিরসন করবে এবং প্রকল্পের গতি ত্বরান্বিত করবে। শরীয়তপুরবাসীর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে এই ২৭ কিলোমিটার সড়ক দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কেবল সময় বাড়ানোই সমাধান নয়, বরং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করাই হোক প্রশাসনের প্রধান অঙ্গীকার। উন্নয়ন যেন কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির নাম না হয়, সেটিই আমাদের কাম্য এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অধিকার।



