পটুয়াখালীতে খেয়াঘাট দখল: ইজারাদারের লোকজন মারধর, টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
পটুয়াখালীতে খেয়াঘাট দখল, ইজারাদারের লোকজন মারধর

পটুয়াখালীতে খেয়াঘাট দখল: ইজারাদারের লোকজন মারধর ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলায় একটি খেয়াঘাট দখলের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। হরিদেবপুর খেয়াঘাটে গত মঙ্গলবার রাতে এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী ইজারাদারের লোকজনকে মারধর করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে ঘাটটি দখল করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

ঘটনার বিবরণ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য

খেয়াঘাটের ব্যবস্থাপক দীপু সাহা জানান, স্থানীয় সোহেল আকন ও তালেবের নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক লোক ঘাটে এসে তাঁকে এবং অন্যান্য টোল আদায়কারীদের মারধর করেন। পরে সারা দিনের টোল আদায়ের প্রায় ৫০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদেরকে ঘাট থেকে বের করে দেওয়া হয়। দীপু সাহা বলেন, "ঘটনার কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনী ও পুলিশ এলাকায় পৌঁছালে আমরা আবার ঘাটে যাই, কিন্তু দখলকারীরা আবার হামলা করলে নিরাপত্তার কারণে সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হই।" বর্তমানে খেয়াঘাটটি দখলকারীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তাঁরা টোল আদায় করছেন বলে তিনি জানান।

ইজারাদারের অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

খেয়াঘাটের ইজারাদার শিবু লাল দাস দাবি করেন, জেলা পরিষদ থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে তিনি হরিদেবপুর খেয়াঘাটের ইজারা পেয়েছেন, যার মেয়াদ আগামী ৩০ চৈত্র পর্যন্ত রয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে দখলকারীরা তাঁর লোকজনকে মারধর করে টোলের টাকা ছিনিয়ে নিয়ে ঘাট দখল করে নেন। শিবু লাল অভিযোগ করেন, ঘটনার পর জেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশকে জানানো হলেও দখলকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আজ বুধবার দুপুরেও দখলকারীরা ঘাট থেকে টোল আদায় করছে বলে তিনি জানান।

রাজনৈতিক প্রভাব ও নাম ব্যবহারের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, দখলে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা এবারের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু দখলের সময় তাঁরা স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকের নাম ব্যবহার করেছেন। খেয়াঘাট দখলের নেতৃত্বে থাকা সোহেল আকন দাবি করেন, "জনগণের স্বার্থে মন্ত্রী মহোদয় খাস আদায়ের মাধ্যমে পাঁচ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করেছেন, তাই স্থানীয় মাঝিরা সেই অনুযায়ী ভাড়া নিচ্ছেন।" তবে মন্ত্রী এলেই এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন কি না, এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।

স্থানীয় সংগঠনের জড়িত থাকার অভিযোগ

খেয়াঘাট দখলে গলাচিপা ছাত্রঅধিকার পরিষদের তরিকুল ইসলাম (মুন্না) ও তাঁর লোকজনও জড়িত আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তরিকুলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। গলাচিপা ছাত্রঅধিকার পরিষদের সভাপতি আরিফ বিল্লাহ জানান, তিনি ঘটনা শুনে তরিকুলের কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। তরিকুল দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তিনি অন্য একটি কাজের খেয়াঘাটে ছিলেন এবং খেয়াঘাট দখলের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের নদী পারাপারে ভোগান্তি না হয়। খেয়াঘাটটি যেহেতু জেলা পরিষদের অধীন, তাই টোল আদায়ের বিষয়ে জেলা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান (সোহেল) জানান, ইজাদার শিবু লাল দাস জেলা পরিষদের বৈধ টোল আদায়কারী হিসেবে নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছেন এবং তাঁর ইজারার মেয়াদ ৩০ চৈত্র পর্যন্ত বহাল। দখলের বিষয়টি ইজারাদার তাঁকে মুঠোফোনে জানিয়েছেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর ও জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা পুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করবেন।

প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া

পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, "খেয়াঘাট দখলকারী ব্যক্তিরা নির্বাচনের আগে আমার বিরোধিতা করেছেন, পরে আবার বিভিন্ন বিষয়ে আমার কাছে এসেছেন। আমি তাঁদের স্পষ্ট জানিয়েছি, আইনের বাইরে কোনো কিছু করা যাবে না। কেউ আমার বা আমার দলের নাম ব্যবহার করে অন্যায় করলে তার দায়ভার আমি নেব না।" এই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।