লালমনিরহাটে ইউপি চেয়ারম্যানের জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার, ভিজিএফ কার্ড কেলেঙ্কারির জের
ইউপি চেয়ারম্যানের জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার, ভিজিএফ কেলেঙ্কারি

লালমনিরহাটে ইউপি চেয়ারম্যানের জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার মদাতি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লবকে জামিনে মুক্তির পরপরই জেলগেট থেকে পুনরায় আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে এই আটকের পর আদিতমারীর বিএনপির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ নিয়ে কথোপকথন ফাঁস

সম্প্রতি ভিজিএফ কার্ডের বরাদ্দ নিয়ে মদাতি ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির দুই নেতার মোবাইলে কথোপকথনের দুটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে শোনা যায়, বিএনপির নেতারা লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুলের জন্য ভিজিএফ কার্ডের থার্টি পারসেন্ট বরাদ্দ নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করছেন।

কল রেকর্ডে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সবুজ ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লবের কথোপকথন উঠে আসে। পরে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। কথোপকথনে সবুজ চেয়ারম্যান বিপ্লবকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘এমপি সাহেবের থার্টি পারসেন্ট আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন?’ জবাবে বিপ্লব বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা মিটিং করেছি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।’

কথোপকথন ফাঁসের পর গ্রেফতার

কথোপকথন ফাঁসের ঘটনার পর গত ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা এক মামলায় ওই ইউপি চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করা হয়। তার স্ত্রীর অভিযোগ, ভিজিএফ কার্ডে এমপির থার্টি পারসেন্ট নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মোবাইলে কথার জেরেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সোমবার দুপুরে লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ মো. হায়দার আলী কালীগঞ্জের ওই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জাহাঙ্গীর আলমকে জামিন দেন। তবে মঙ্গলবার সকালে লালমনিরহাট জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জেলা কারাগারের ফটক থেকে ডিবি পুলিশের সদস্যরা আবার তাকে আটক করেন।

জেলগেটে ধস্তাধস্তি ও বিতর্ক

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জেলগেটে চেয়ারম্যানের ছোট ভাই অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির কাজল ও স্বজনরা বিপ্লবকে অভ্যর্থনা জানিয়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় ডিবি পুলিশের একটি দল পথরোধ করে। ধস্তাধস্তির মধ্যে পুলিশ জোর করে বিপ্লবকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় বিপ্লবের ভাই আইনজীবী হুমায়ুন কবির বিপ্লবকে আটকের কারণ জিজ্ঞাসা করেন।

তখন ডিবি দল বিপ্লবকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলছিল। হুমায়ুন সামনে দাঁড়ালে ডিবি বলে, ‘তোর আইনজীবী ছুটায় দেবো।’ হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সোমবার বিকালে লালমনিরহাট জেলা কারাগার থেকে আমার বড় ভাইয়ের জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তবে জামিনের কাগজ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে দেরিতে পৌঁছানোয় সেদিন ছাড়া পাননি। মঙ্গলবার সকালে লালমনিরহাট জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু জেলগেটের সামনে থাকা ডিবি পুলিশ ভাইকে আটক করে নিয়ে যায়।’

নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, ‘পরে জানতে পারি, আদিতমারীর বিএনপির কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ করা একটি মামলায় আমার ভাইকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ মামলায় আমার ভাই এজাহারনামীয় আসামি নন। মঙ্গলবার বিকালে লালমনিরহাটের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আমার ভাইয়ের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে কারাগারে পাঠানো হয়।’

তিনি ডিবির আচরণের সমালোচনা করে বলেন, ‘ডিবির কাছে তাকে পুনরায় আটকের কারণ জানতে চাইলে আমার সঙ্গে তারা খারাপ ব্যবহার করেন। আমি আইনজীবী, আমাদের একটা সম্মান আছে। এভাবে অপমান করা ঠিক হয়নি ডিবির।’ জাহাঙ্গীর আলমকে জেলগেট থেকে ফের গ্রেফতারের ঘটনাটিকে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে মন্তব্য করেছেন।

পুলিশের বক্তব্য

লালমনিরহাটের ডিবি পুলিশের ওসি সাদ আহমেদ বলেন, ‘আদিতমারী থানার পুলিশের রিকুইজিশন মোতাবেক ওই ইউপি চেয়ারম্যানকে জেলগেট থেকে আটক করেছিল ডিবি।’ আইনজীবীর সঙ্গে খারাপ আচরণের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘সে বিষয়টি নজরে আসেনি। তবে আসামি আটকের সময় বাধা দিয়েছেন। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়েছে।’

চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক পরিচয়

প্রসঙ্গত, জাহাঙ্গীর হোসেন বিপ্লব কালীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বিগত ইউপি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ নিয়ে কথোপকথন ফাঁস ও পরবর্তী গ্রেফতার-মুক্তি-পুনরায় গ্রেফতারের এই ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।