ঈদে গাজীপুরে যানজটহীন যাত্রা, ন্যায্য ভাড়ায় খুশি ঘরমুখো মানুষ
ঈদে গাজীপুরে যানজটহীন যাত্রা, ন্যায্য ভাড়ায় খুশি মানুষ

ঈদে গাজীপুরে যানজটহীন যাত্রা, ন্যায্য ভাড়ায় খুশি ঘরমুখো মানুষ

ঈদুল ফিতরের ছুটিতে গাজীপুর জেলায় শুরু হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের শহর থেকে গ্রামে ফেরার পালা। শেকড়ে ফেরার আনন্দে উদ্ভাসিত তাদের চোখেমুখে, আর মহাসড়কে নেমেছে ঘরমুখো মানুষের ঢল। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দুপুর ১২টার পর থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যাত্রীদের চাপ বাড়তে শুরু করেছে, সন্ধ্যায় তা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যানজটহীন যাত্রা ও ন্যায্য ভাড়া

সরেজমিনে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনের তুলনায় মঙ্গলবার সকাল থেকেই বাসকাউন্টারে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। অনেকে ব্যাগ-বস্তা নিয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য রওয়ানা হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। যাত্রীরা পছন্দ অনুযায়ী পরিবহণে দরদাম করে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছেন, যা এবারের ঈদে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উঠে এসেছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও সকাল থেকেই যাত্রী ও গণপরিবহণের চাপ লক্ষ্য করা গেছে। যানজট না থাকলেও যানবাহন ধীর গতিতে চলছে। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দুই মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ৪ শতাধিক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যা যানজট নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

শিল্পাঞ্চলে ছুটি ও বেতন-বোনাস পরিশোধ

গাজীপুর জেলায় ছোটবড় প্রায় ৫ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে, যেখানে প্রতি ঈদে বেতন-বোনাস ইস্যুতে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইতোমধ্যে ৯৫ শতাংশ কলকারখানায় বকেয়া বেতন ও ৯১ শতাংশ ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদে ছুটিতে যাওয়ার আগেই বাকি কারখানার বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হবে, যা শ্রমিকদের মধ্যে সন্তোষ তৈরি করেছে।

কারখানা ও শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এবারের ঈদে গাজীপুরের ২ হাজার ৭৫৩টি কারখানায় পূর্ণ ছুটি দেওয়া হচ্ছে, আর ৮১টিতে আংশিক ছুটি হয়েছে। ছুটি ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হচ্ছে: সোমবার ৬২টি, মঙ্গলবার ৪৪৪টি, বুধবার ১,৪১৪টি ও বৃহস্পতিবার ৮৩৩টি কারখানা ছুটি পাবে। এই ধাপে ধাপে ছুটির ব্যবস্থা যানজট কমাতে সাহায্য করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

যাত্রী ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

সানোয়ার হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, "মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ডিউটি করিয়ে কারখানা ছুটি দিয়েছে। ব্যাগ গুছিয়ে অফিসে নিয়ে গেছিলাম, ছুটি হওয়ার পরেই সোজা অফিস থেকেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছি। আজ মোটামুটি চাপ কম থাকবে, বেশিরভাগ কারখানা ছুটি বুধবার।"

কাউসার আহাম্মদ নামে অন্য এক যাত্রী যোগ করেন, "অনেকদিন ছুটি পেয়েছি, পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। আজ ভাড়া বেশিও নিচ্ছে না, আবার যানজটও নেই। মনে হচ্ছে ভালোভাবে বাড়িতে যেতে পারব।"

কোনাবাড়ী নাওজোর হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলম বলেন, "মঙ্গলবার দুপুর থেকে যাত্রীদের চাপ বেড়েছে এবং বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা বাড়বে। যানজট নিরসনে হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের সদস্যরা কর্মরত রয়েছেন। গার্মেন্টস কারখানাগুলো একসঙ্গে ছুটি না দিয়ে ধাপে ধাপে ছুটি দিচ্ছে, তাই এবার যানজট কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।"

পুলিশের প্রস্তুতি ও তত্ত্বাবধান

গাজীপুর মহানগর ট্রাফিক পুলিশের কমিশনার এসএম আশরাফুল আলম জানান, গাজীপুর মহানগর এলাকায় যানজট নিরসনে তাদের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। মহাসড়কে পেট্রল টিম, মোবাইল টিম ছাড়াও সাদা পোশাকে প্রায় এক হাজারের মতো মহানগর পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।

গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন জানিয়েছেন, তাদের আওতাধীন ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ও কালীগঞ্জ এলাকায় বিশ্বরোডে ৮ শতাধিক জেলা পুলিশ ট্রাফিক ডিউটিতে আছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আমজাদ হোসেন বলেন, "পোশাক কারখানা সোমবার থেকে ছুটি শুরু হয়েছে। এবারের ছুটি ধারাবাহিকভাবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অধিকাংশ কারখানায় বেতন বোনাস দেওয়া হয়েছে, ফলে কোনো ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ নেই।"

এভাবে, গাজীপুরে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ন্যায্য ভাড়া, যানজটহীন যাত্রা ও সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা যাত্রী ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।