অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ, সংস্কার বিতর্কে বিএনপির অবস্থান
অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ

অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ, সংস্কার বিতর্কে নতুন মোড়

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা এখন শেষ হতে চলেছে। বিশেষ কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে জাতীয় সংসদ ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন করলেও বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হয়নি। বাকি চারটি রহিত করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি রহিত ও পুনঃপ্রচলন করা হয়েছে। এই ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তীতে পুনর্যাচাই করে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

অধ্যাদেশগুলোর প্রকৃতি ও প্রভাব

এই ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত একটি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়–সংক্রান্ত দুটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন–সম্পর্কিত তিনটি, গুম প্রতিরোধ–সংক্রান্ত দুটি এবং দুদক–সম্পর্কিত একটি অধ্যাদেশ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে উত্থাপিত অধ্যাদেশটি অনুমোদন বা পাস করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে পাস না হলে অথবা সংসদ অনুমোদন না দিলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা বাতিল হয়ে যায়। ১০ এপ্রিলের পর সংসদে উত্থাপন না করায় ওই অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা হারিয়েছে। এরই মধ্যে কিছু অধ্যাদেশ সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে বাতিলও করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমনে প্রশ্ন

এই পটভূমিতে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি ক্ষমতাসীন দলকে স্বেচ্ছাচারিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের প্রত্যাশা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছে? সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদ কি বাস্তবায়নের আগেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে? এসব প্রশ্নের বাইরে গিয়ে অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিতের বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিএনপির অবস্থান ও সংস্কার প্রক্রিয়া

বিএনপি বারবার বলছে, তারা সংস্কারের বিরোধী নয়; বরং আপত্তি তাদের সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। বাস্তবে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সংস্কার প্রস্তাবেই পদ্ধতিগত দুর্বলতা ও বিতর্ক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জুলাই সনদের আওতায় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবকে মাত্র চারটি প্রশ্নে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এত জটিল ও বহুমাত্রিক সংস্কারকে এভাবে সরলীকরণ করার প্রস্তাবটি শুধু রাজনৈতিক দল নয়, নাগরিক সমাজের অনেকের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়নি। বিএনপি এ বিষয়ে একাধিক ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও দিয়েছিল। দলটি শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে, তারা ক্ষমতায় এলে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এবং সংসদীয় প্রক্রিয়া মেনে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। অর্থাৎ তাদের অবস্থান সংস্কারের বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে।

অধ্যাদেশ জারির তাড়াহুড়া ও পদ্ধতিগত ত্রুটি

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একেকটি অধ্যাদেশ গড়ে পাঁচ দিনের কম সময়ে তাড়াহুড়া করে জারি করা হয়েছে। সংসদীয় আলোচনা, জনমত যাচাই বা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সংলাপ ছাড়াই এগুলো প্রণীত হয়েছে। ফলে এগুলোয় বিএনপিসহ অন্যান্য দলের আপত্তির জায়গা রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’-এ সরকারের প্রতিনিধিত্ব সীমিত রাখা হয়েছে, যা আইন মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাইলে তা সংসদীয় তদারকি ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের মাধ্যমে হওয়া উচিত, কোনো অনির্বাচিত সরকারের ডিক্রিতে নয়। একইভাবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ দুটিতে প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের নামে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। দুদক অধ্যাদেশে কমিশনার সংখ্যা বৃদ্ধি দুর্নীতি দমনে সত্যিকারের দক্ষতা বাড়াবে, নাকি রাজনৈতিক পুনর্বাসনের দরজা খুলবে, সেই প্রশ্নও অমীমাংসিত। গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ দুটিও আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সঙ্গে সমন্বয় না করে জারি করায় বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশেও একই ধরনের পদ্ধতিগত ঘাটতি লক্ষণীয়।

সংস্কারপ্রক্রিয়া ব্যর্থতার কারণ

সংস্কারপ্রক্রিয়া কেন ব্যর্থ হয়—এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, স্থানীয় পটভূমি উপেক্ষা, আমলাতান্ত্রিক চাপ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় এ বিষয়গুলোর প্রতিফলন দেখা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সংস্কার উদ্যোগই স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। যেমন মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কিছু প্রস্তাব বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে নতুন ধরনের বিতর্ক তৈরি করতে পারত। আবার কিছু অধ্যাদেশে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। এ ছাড়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাদ দিয়ে সংশোধিত অধ্যাদেশ প্রণয়ন করায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।

জনমত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ পদ্ধতিগত বিতর্কের গভীরতা উপলব্ধি করে না; তারা ফলাফল দেখে বিচার করে। ফলে জনমনে যে বার্তাটি পৌঁছাচ্ছে, তা বিএনপির জন্য খুব ইতিবাচক নয়। অনেকেই মনে করছেন, দলটি ‘সংস্কারবিরোধী’ বা ‘জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে’। এই শূন্যতাকে কাজে লাগাচ্ছে বিরোধী দলগুলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তারা এমন ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে বিএনপিকে সংস্কারবিমুখ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই বর্ণনা ধীরে ধীরে জনমনে প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানিসংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুরবস্থা। এসব কারণে জন–অসন্তোষ বাড়ছে, যা রাজনৈতিকভাবে সহজেই ব্যবহারযোগ্য একটি উপাদানে পরিণত হতে পারে।

বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি একাধিক চাপে রয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকার ও সুশাসনের মানদণ্ড বজায় রাখার চাপ, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও জনমুখী প্রত্যাশা; এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। এই পটভূমিতে বিএনপির জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তাদের স্পষ্টভাবে জনগণকে বোঝাতে হবে কেন কিছু অধ্যাদেশ বা প্রস্তাব তারা বাতিল করেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, একটি নীতিগত ব্যাখ্যা হিসেবেও তুলে ধরতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের ক্ষেত্রে বলা যায় যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আরও সুদৃঢ় করা হবে, যাতে কোনো অনির্বাচিত কর্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়। একইভাবে দুদক ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে উত্থাপন করা হবে, যাতে দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার রক্ষা সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়। এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট—জুলাই সনদের বাস্তবায়ন গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে হবে, যা সংসদীয় আলোচনায় আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদার করতে হবে, যাতে জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধীদের ছড়ানো ‘সংস্কারবিমুখ’ ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে সক্রিয় কাউন্টার-ন্যারেটিভ তৈরি করা দরকার। বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের প্রতিশ্রুতি, জুলাই সনদের নোট অব ডিসেন্টসহ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার এবং নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আশ্বস্ত করতে হবে যে তারা কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সংস্কার বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে তা স্থানীয় বাস্তবতার আলোকে। মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে বিএনপি সরকারের অঙ্গীকার অটুট রাখতে হবে, যাতে দেশের অর্থনৈতিক সহায়তা ও বৈশ্বিক সম্পর্ক ক্ষুণ্ন না হয়। পাশাপাশি সংস্কারপ্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি। চতুর্থত, জনজীবনের তাৎক্ষণিক সংকট, বিশেষ করে জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান—এসব সমস্যার সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, রাজনৈতিক আস্থার বড় একটি অংশ নির্ভর করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উন্নতির ওপর। সংস্কারের নামে জনদুর্ভোগ বাড়লে তা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হবে। পঞ্চমত, বিএনপি সরকারকে ১৬টি অধ্যাদেশকে পুনর্বিবেচনা করে আরও শক্তিশালী, বাস্তবসম্মত ও সব অংশীজনের মতামত অন্তর্ভুক্ত করে নতুন বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের মতামত, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—সবকিছু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে সংস্কারপ্রক্রিয়া আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে।

শেষ কথা

অধ্যাদেশ বাতিল করা নিয়ে বিতর্ক আমাদের একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে। সেটি হলো, সংস্কার কী করা হচ্ছে, সেটি শুধু নয়; বরং কীভাবে করা হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সবচেয়ে ভালো উদ্দেশ্যও জন–আস্থার সংকটে পড়ে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুধু সংস্কার চালু রাখা নয়, বরং সেই সংস্কারকে জনমালিকানাভিত্তিক, সাংবিধানিক এবং টেকসই করে তোলা। তা না হলে পদ্ধতিগত সংকটই শেষ পর্যন্ত গভীর আস্থার সংকটে রূপ নেবে।